ভ্রমণের নেশা কমবেশি আমাদের সবার অন্তরে লুকায়িত থাকে । আমি ব্যক্তিগতভাবে একজন ইন্ট্রোভার্ট অন্তর্মুখী মানুষ । পরিবারের গন্ডি পেরিয়ে আমি কোথাও যাওয়া পছন্দ করি না । আমার সময় কেটে যায় পরিবারে সবার সাথে সময় দিয়েই । তবে পরিবারের সাথে একসাথে ভ্রমণের আনন্দ কে আমি খুবই উপভোগ করি তাই যখনই পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো ভ্রমণের আয়োজন করা হয় তখন আমি সে সুযোগ হাতছাড়া করি না । সচরাচর একজন মেয়ে হিসেবে আমার শুধুমাত্র কলেজে যাওয়া হয় । এছাড়া তেমন কোন স্থান দেখার সৌভাগ্য আমার হয়ে ওঠেনি । আমি পরিবারের সাথে কক্সবাজার ভ্রমনে গিয়েছিলাম । আজকে সেই ভ্রমণের কিছুটা স্মৃতিচারণ করবো এই কনটেস্টে
কক্সবাজার বাংলাদেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান হওয়ায় সারা দেশ থেকে অনেক মানুষ কক্সবাজারে যায় । কক্সবাজারে যে এত মানুষের সমারোহ ঘটে তা সেখানে না গেলে বুঝতে পারতাম না । সময়টা ছিল গত বছরের শীতের প্রথম দিকে । আমার পরিবার থেকে সবাই মিলে কক্সবাজার ভ্রমণের উদ্যোগ নেয়া হয় । আমি গাড়িতে ভ্রমণ খুব বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না কারণ যেহেতু এই ভ্রমণের সাথে অভ্যস্ত না । অনেক সময়ই একটু বেশি জার্নির ফলে বমি আসে তাই এই ভ্রমণটি আমার কাছে একটু অস্বস্তির বৈকি ।
আমরা যাত্রা করেছিলাম রাতে যাতে করে সকালে গিয়ে পৌঁছতে পারি । কুমিল্লা শহর থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব মোটেও কম নয় তবুও আমরা খুব ভোরে কক্সবাজার পৌঁছে যাই । এরপর হোটেল যখন ম্যানেজ করতে থাকে তখন খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো । পুরুষ সদস্যরা হোটেল ম্যানেজ করতে গিয়ে প্রায় ভিজে গিয়েছিলেন । অবশেষে একটি ফ্ল্যাট সিস্টেমের হোটেল আমরা পেয়েছিলাম যেখানে তিন রুমে আমাদের সবার প্রায় সংকুলান হয়ে গিয়েছিল । আমরা যেহেতু ফ্যামিলি টুরে গিয়েছিলাম সেহেতু আমাদের সাথে বাচ্চারা ছিল এবং আমরা গাড়িতে করে সিলিন্ডার এবং কিছু হাড়ি পাতিল নিয়ে যাই । ফলে পূর্বের রান্না করা সেসব খাবার থেকে সকালের নাস্তা হয়ে যায় ।
সবাই কিছুটা ফ্রেশ হওয়ার পর আমরা বেরিয়ে পড়ি সমুদ্র সৈকতের দিকে । যেহেতু আমার জন্য এটা একেবারেই নতুন এবং প্রথম ভ্রমণ আমি কিছুই চিনতে পারছিলাম না । তাই আমার ভাইকে আমি অনুসরণ করতে থাকি । ভাই আগেই বলে নিয়েছিলেন যাতে আমরা গোসলের প্রস্তুতি নিয়ে বের হই । সাগরের পানি অত্যন্ত লবণাক্ত ছিল । দেখতে পানি স্বাভাবিক পানির মতই কিন্তু যখনই পানি মুখে নিলাম তখন তা এত লবণাক্ত ছিল বলে বোঝানো যাবে না । সাগরের পানি লবনাক্ত হয় আগে শুনেছি কিন্তু এত লবণাক্ততা প্রথম উপলব্ধি করলাম । আমরা সাগরে নামতে ভয় পাচ্ছিলাম কিন্তু যখন দেখলাম আশেপাশের লোকজন অনায়াসেই অনেক দূর পর্যন্ত চলে যাচ্ছে তখন আমাদের ভয় কেটে গেল । আমরা যেহেতু গ্রামের মানুষ সবাই সাঁতার জানি তাই আমাদের খুব বেশি অসুবিধা হয়নি সাগরের অনেকটা দূরে চলে যেতে । আমি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে গোসল সাথে থাকি এবং সাগরের পানিতে খেলাধুলা করা খুব উপভোগ করছিলাম । কিন্তু হঠাৎ করেই আবার বৃষ্টি এসে আঘাত হানলো । সবাই দৌড়ে খুব দ্রুততার সাথে পানি থেকে উঠে গেছিল । কেউ কেউ আবার হোটেলের দিকে ফিরে যাচ্ছিল । আমাদের সাথে অন্যান্য কিছু সদস্য তখনো বৃষ্টিতে পানিতে খেলা করছিল । তাই আমরা তীরেই একটি ছাতার নিচে তাদের জন্য অপেক্ষা করি এবং তাদের এই আনন্দ আমরা দেখে উপভোগ করতে থাকি । বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি বড়জোর আধাঘন্টা হবে । বৃষ্টি থেমে যাওয়াতে গোসল সেরে আমরা আবার হোটেলের দিকে ফিরে আসি
সাগরে গোসল করার ফলে গায়ে যে এত বালি লেগে যায় তা আগে জানা ছিল না । হোটেলের নিচে আসতে দেখি হোটেলের বয় বলে দিচ্ছে নিচ থেকে বালি আবার পরিষ্কার করে তারপর উপরে যেতে । যখন পরিষ্কার করছিলাম তখন বুঝতে পারলাম কাপড়চোপড় বালিতে ভরে গিয়েছে । যাহোক আমরা হোটেল রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য নিচে এসে লাঞ্চ করে নেই । পরিবারের বাবা মা ভাই বোন এবং বাচ্চাদের সাথে একসাথে এরকমভাবে ভ্রমণ ও খাওয়া-দাওয়া করা খুবই উপভোগ্য । আপনাদের যদি কারো পরিবারের সাথে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থাকে তাহলে সেটা বুঝতে পারবেন । আশেপাশে অনেককেই দেখছিলাম যারা কিনা এরকম পরিবারের সাথে এসেছে আবার কেউ বা বন্ধুদের সাথে এসেছে । অনেকের গায়ে বিভিন্ন রকম লেখা দেখতে পাচ্ছিলাম এবং একই রকম টি-শার্ট বা ইত্যাদি পড়ে আছে । এতে বুঝতে পারছিলাম তারা সবাই একই স্কুল কলেজ বা প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছে । তাদেরকে দেখে খুব একতাবদ্ধ মনে হচ্ছিল । সর্বোপরি দেখতে ভালই লাগছিল
বিকেল বেলা যখন প্রায় সাড়ে তিনটা চারটার দিকে আমরা আবার সাগর পাড়ের দিকে হাঁটতে বের হলাম তখন সবাই খুব ফ্রেশ ছিলাম এবং স্নিগ্ধ ছিলাম । একপাশ থেকে বাতাস আসছিল আর আমরা কথা বলতে বলতে হেঁটে সামনের দিকে এগুচ্ছিলাম । এক পাশে সাগর গুঞ্জন অন্যদিকে স্নিগ্ধ বাতাস এবং বিকেল বেলা । কত মনোরম ছিল সেই দৃশ্য আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না । যারা বিকেলবেলা এরকম পরিবেশে যাননি তাদের জন্য এটা বলে আসলে বোঝানো যাবে না । তাই যদি সুযোগ পান অবশ্যই এরকম অনুভূতি নেয়ার জন্য কক্সবাজারের বঙ্গোপসাগর এর কাছে ছুটে যাবেন । এই বিকেলবেলার হাটি আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও মনমুগ্ধকর ছিল । আমি আমার এই ছোট জীবনে এরকম অনুভূতি কখনো পায়নি । তাই কষ্ট করে এত লম্বা জার্নি করে সাগর পাড়ে ছুটে যাওয়ার মজাটাই ছিল এরকম । এবং আমার কষ্ট এই বিকেলবেলার আনন্দে সার্থক হয়েছে ।
আমরা মোবাইল ছাড়া তেমন কোনো ভাল ক্যামেরা নিয়ে যায়নি তাই বিভিন্ন ফটোগ্রাফারদের দিয়ে ছবি তুলেছিলাম । সন্ধ্যার পর আমরা আশেপাশের মার্কেটগুলোতে করেছিলাম এবং বিভিন্ন কেনাকাটা করেছিলাম । আর তখনই আমরা স্টুডিও থেকে আমাদের ছবিগুলো মোবাইল ফোনে নিয়ে নেই । ডিএসএলআর দিয়ে তোলা এই সব ছবিগুলো আমাদের মোবাইল ফোনের চেয়ে অনেক অনেক গুণ ভালো কোয়ালিটির ছিল । তাই ছবিগুলো আমরা সবাই খুব পছন্দ করি এবং আসলেই খুব সুন্দর হয়েছিল । এভাবে করেই আস্তে আস্তে আমাদের ভ্রমণ কেনাকাটার মধ্য দিয়ে শেষ হয় । কারণ একই রাতে আমরা আবার ব্যাক করি । আমাদের প্রোগ্রামটি এমনভাবে সাজানো ছিল আমরা মাইক্রো নিয়ে গিয়েছিলাম আবার সেই মাইক্রোতে ফিরে এসেছিলাম । ভবিষ্যতে কখনো যদি যাওয়ার সুযোগ হয় তখন কক্সবাজার এর আশেপাশে আরো যেসব দর্শনীয় স্থান রয়েছে এবং বিভিন্ন মার্কেট রয়েছে সেগুলো ভ্রমণ করব করার ইচ্ছা রয়েছে । সবাই ভাল থাকবেন এবং আমার জন্য দোয়া করবেন যাতে আমি এখানে ভালো কিছু করতে পারি । আরেকটি ব্যাপার যদি এখানে কিছু নতুন ভাবে বুঝতে না পারি তাহলে আপনাদের সাথে শেয়ার করবো আপনারা সহযোগিতা করার চেষ্টা করবেন