রাত বিরাতে জেগে থাকার কুফল হলো মাথায় উদ্ভট ভাবনা ঘুরে । তবে আজকের ভাবনাটা উদ্ভট না , ছোটবেলার স্মৃতি তাও আবার ঈদ কেন্দ্রীক ! ঈদ-উল-আজহা তো এসেই পড়লো , বাকি আছে মাত্র দুইদিন । মানুষজন তাদের কুরবানীর পশু আনা শুরু করেছে। কিন্তু ঈদ ঈদ যে একটা ভাব তা পাচ্ছিনা ।গ্রামের বাড়ি যাওয়া হবেনা যে তাই হয়তো !
ছোট থেকেই দুই ঈদ করতে গ্রামের বাড়ি বরিশাল যেতাম । অন্যান্য ছুটিতে আব্বুর ছুটি থাকতোনা , তাই বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হতো শুধু ঈদেই । ঈদ-উল-ফিতর এর সময় বাড়ি যাওয়ার এক্সসাইটমেন্ট শুরু হতো প্রথম সাহরী খাওয়ার পর থেকেই ! আমি আর আমার বোন ক্যালেন্ডারে দিন গুনে গুনে রাখতাম ।আব্বু ছুটি পেতো সেই ঊনত্রিশ রোজা থেকে , কিন্তু আমার আর আমার বোনের ব্যাগ গুছানো শুরু হতো সেই প্রথম রোজা থেকেই ! রোজ কয়েকবার ব্যাগ গুছাতাম যাতে কিছু থেকে না যায় , যেতাম কেবল তিন দিনের জন্য কিন্তু তা নিয়েই কত শত পরিকল্পনা করতাম ।মাস খানেক ধরে ব্যাগ গুছাতাম , ঈদ এর জামা আলাদা করে রাখতাম , অন্য জামা আলাদা কিন্তু এতদিন শেষে আম্মুর হাত না পরলে ব্যাগে সব ঠিক ভাবে ঢুকতো না !মা ছাড়া জীবন আসলেই অগুছালো ...
তখন তো এতো এতো ফোন ছিলোনা , গ্রামের বাড়িতে বিদ্যুৎও ছিলোনা , সারাদিন মাঠে ঘাটে দৌড়ে বেড়াতাম , আমার বয়সী প্রায় বিশ জন ছেলে মেয়ের সাথে গ্রাম ঘুড়ে বেড়াতাম , সন্ধ্যায় ঘরে ফিরলে ফুপ্পি আর আম্মু হাত মুখ ধুইয়ে দিলে বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে যেতাম , আবার উঠতাম সেই ভোর বেলায় , ফজরের সময় ।এখন বিদ্যুৎ আছে , ফোন আছে , গ্রামে গেলেও সেই রাত জেগে জেগে নিউজফিড স্ক্রল করি , দেরী করে উঠি , সবার হাতে হাতে ফোন , আগের মতন আড্ডা হয়না , গানের কলি খেলা হয়না , ফুল টোক্কা খেলা হয়না ।এখন আগের মতন কিছুই হয়না !
ঊনত্রিশ রোজায় ইফতারের নামে খেজুর মুখে দিয়েই সবাই মিলে দৌড়ে যেতাম চাঁদ দেখতে ! চাঁদ দেখতে পেলেই সব পিচ্চিরা মিলে উঠোনে মিছিল দিতাম , বাজি ফুটাতাম , তাঁরাবাজি হাতে নিয়ে হইহুল্লোড় করতাম , হাত ভরে মেহেদী দিতাম ।এখন তো পাঁচ মিনিটে রং হবার মেহেদী অহরহ পাওয়া যায় , তখন মেহেদী রাত ভর লাগিয়ে রাখা লাগতো ।সকালে ঘুম থেকে উঠে সবার হাতের মেহেদীর রং দেখতাম , আব্বু আর চাচারা ঈদের জামাত পড়তে যাওয়ার আগেই গোছল সেরে ঈদের জামা পরে ফেলতাম । সেমাই খেতাম , মলিদা(নারকেল আর চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরী পানিও) পান করতাম । নামাজ পড়ে সবাই ফিরলে সালামী পেতাম !
ঈদ-উল-আজহা তেও বাড়ি যেতাম ঈদ এর এক দুইদিন আগে। আব্বু আর চাচা তখন সবাই বাড়িতে কুরবানী দিতো , সবাই একসাথে হতাম , মজা হতো । কুরবানীর পর গোস্ত কাটার আগে সবাই একসাথে কলা পাতাতে করে খিচুড়ি খেতাম , এখন আর সেই আমেজটা নেই ।
বড় হয়ে গেছি , এখন ঈদ বাদেও এতবার বাড়ি যেতে পারি যে মাঝে মাঝে ঈদেই বাড়ি যাইনা ! দাদা মারা গেলেন , দাদী শয্যাশায়ী , আমরা বড় হলাম আর আমাদের বাবা-মায়েরা ?! তাদেরও আমরা আস্তে আস্তে বয়স্ক হতে দেখলাম !
এখন আর আগের মতন দৌড়ে চাঁদ দেখতে যেতে হয়না , ফোনের বদৌলতে আগে থেকেই বুঝে যাই ঈদ কবে ! রোজা ঊনত্রিশটা হবে নাকি ত্রিশটা ! বড় হতে হতে ছোটবেলাটা যে হারিয়ে গেছে সেটা টেরই পাইনি ! লঞ্চে করে ঈদ করতে বাড়ি যাওয়ার আমেজটা আর পাইনা , হয়তো পাবোও না । ছোটবেলার স্মৃতিগুলো এমনই হায় তাইনা?! মিষ্টি , তবে অজান্তেই মন খারাপ করে দেয় ।আমার মতন আপনাদেরো অনেক স্মৃতি আছে ঈদ নিয়ে তাইনা ?! আমাকে কমেন্টের মাধ্যমে জানাবেন কিন্তু । আজকের মতন বিদায় নিচ্ছি , লেখাটি পড়বার জন্য ধন্যবাদ ।