ধারাভাষ্যকার আতহার আলী খান ভীষণ অবাক, ‘এখনো আমি বিশ্বাস করতে পারছি না! সে এটা কী করল?’ এই ‘সে’টা হচ্ছেন লিটন দাস। তীব্র চাপে কী ব্যাটিংটাই না করলেন বাংলাদেশ দলের তরুণ উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান। দুর্দান্ত খেলে টেস্টে নিজের প্রথম সেঞ্চুরির সুবাস যখন ইন্দ্রিয়ে আসতে শুরু করেছে, তখন বেছে নিলেন আত্মহননের পথ!
ব্যাকরণ মেনে ধ্রুপদি সব শটে একটু একটু করে এগিয়ে সেঞ্চুরি থেকে যখন মাত্র ৬ রান দূরে, হঠাৎ পাগলামি। অহেতুক রঙ্গনা হেরাথকে তুলে মেরে বিক্রম দেখানোর চেষ্টা। ফলাফল? মিড অফ থেকে পেছনে দৌড়ানো দিলরুয়ান পেরেরার দৃষ্টিনন্দন ক্যাচ।
‘কেন, লিটন কেন’—শুধু আতহার কেন, প্রশ্নটা পুরো বাংলাদেশেরই।
অবশ্য লিটনের গল্পটা এমনই, আফসোসের আর আক্ষেপের। নাজমুল আবেদীনের কথা মনে পড়ছে। দেশের আরও অনেক ক্রিকেটারের মতো লিটনও দুঃসময়ে শরণ নেন নাজমুলের । বিসিবির এই ন্যাশনাল গেম ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজারের ভালোভাবেই চেনা লিটনকে। নাজমুল একবার বলেছিলে, ‘নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারলে এখন হয়তো সে তামিম ইকবালের ওপেনিং পার্টনার থাকতে পারত।’
ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিতই রানের ফোয়ারা ছোটান। জাতীয় লিগ, বিসিএল, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ মানেই লিটনের দ্যুতিময় ব্যাটিং। বাংলাদেশের ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির এক মৌসুমে মিনহাজুল আবেদীনের সর্বোচ্চ ১০১২ রানের রেকর্ডটাও তাঁর অধিকারে। ভালো কিপিং করেন, সম্মোহন করতে পারেন ব্যাকরণসম্মত ব্যাটিংয়ে—দুই গুণের সমন্বয়ে লিটন ২০১৫ সালের জুনে পা রেখেছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে।
ভারতের বিপক্ষে ফতুল্লায় নিজের অভিষেকেই নজরও কেড়েছিলেন। করেছিলেন ৪৫ বলে ৪৪—আহমরি হয়তো নয়। তবে সেদিন লিটনের ব্যাটিং দেখে অনেকের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, ‘এই ছেলে অনেক দূর যাবে।’
স্বপ্নডানা মেলে স্বাচ্ছন্দ্যে উড়তে পারেননি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অবারিত আকাশে। দলে এই ফেরেন, এই বাদ পড়েন—বাংলাদেশ দলে লিটনের জায়গাটা পোক্ত নয়। ঘরোয়া ক্রিকেটের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের অনুবাদ করতে পারেননি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে।
প্রথম শ্রেণিতে তাঁর ব্যাটিং গড় যেখানে পঞ্চাশ ছুঁই–ছুঁই, টেস্টে সেটি ত্রিশের নিচে। কেন পারেননি জাতীয় দলে ধারাবাহিক হতে? লিটন চাপ নিতে পারেন না, আত্মবিশ্বাস নড়বড়ে, খেলায় অপ্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনেছেন, অফ সাইডে দুর্বল—কত কারণ যে শোনা গেল গত দুই বছরে। লিটনের সমস্যাটা কোথায়, জাতীয় দলে তাঁর এক সতীর্থ একবার বলেছিলেন, ‘ঘরোয়া ক্রিকেটে লিটনের ব্যাটিং যখন দেখি, মনে হয় এত নিখুঁত–মনকাড়া ব্যাটিং কীভাবে করতে পারে একজন ব্যাটসম্যান!’
ঘরোয়া আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর পারফরম্যান্সের অদ্ভুত বৈপরীত্য নিয়ে কথা আরও বেড়ে গেল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এই চট্টগ্রাম টেস্টে প্রথম দিনের বিকেলে অফ স্টাম্পের বল ছেড়ে দিয়ে বোল্ড হওয়ায়।
নিজে ভীষণ চাপে। সামাজিক মাধ্যমে তীব্র শ্লেষমাখা তির ছুটে আসছে বিদ্ধ করতে। একটা ব্যর্থ ইনিংস হয়তো অনিশ্চিত ক্যারিয়ারের পথে ঠেলে দেবে নিজেকে। নিজের অস্তিত্বের ম্যাচে এর চেয়ে কঠিন মঞ্চ আর হতে পারত না। শেষ দিনের প্রথম সেশনে শুরুতে একটি উইকেট পড়ে গেলে বাংলাদেশ কোণঠাসা হয়ে যেত। আর সেটি লিটন হলে সব ক্ষোভ কেন্দ্রীভূত হতো তাঁকে ঘিরেই।
আর এই মঞ্চটাকেই লিটন বেছে নিলেন নিজের সেরাটা খেলার জন্য। একটি মিলি সেকেন্ডের ভুল সাজঘরে ফেরাতে পারে, এমন শঙ্কার মুখে ব্যাক ফুটে গিয়ে কাটগুলো করছিলেন যখন; তাঁর ঘোরতর সমালোচকটাও বাহবা দিতে কুণ্ঠিত হয়নি।
লিটন চাপে ভেঙে পড়েন? ২২৭ মিনিট উইকেটে থেকে ১৮২ বল খেলে দেখিয়ে দিলেন। অফ সাইডে দুর্বল? আজ তাঁর সবচেয়ে প্রডাক্টিভ শটই ছিল কাভার ড্রাইভ। সবই ঠিক ছিল। সেঞ্চুরিটা হলে কী দারুণ গল্পগাথা হতো কিন্তু ওই যে লিটন মানে যতটা পাওয়া, তার চেয়ে বেশি না-পাওয়ার আক্ষেপ। ফিরলেন ৯৪ রানে।!