আজ বহুদিন পর আমি রাজবাড়ি যাচ্ছি, মনে অনেক আনন্দ আবার কিছুটা ভয় ও পাচ্ছি, এ ভয় অন্যরকম ভয়। রাজবাড়ি, নামটা মুখে আসতেই কেমন যেন অন্যরকম ভাললাগা কাজ করছে। যদিও বাড়িতে যাওয়ার জন্য এখন মনটা ছটফট করছে, জীবনটা প্রতিদিন দুর্বিষহ হয়ে যাচ্ছে যে হারে জিনিসপত্রের দাম বজেতে নিম্ন আয়ের লোকজন চাইলেও বাড়িতে যেঁতে পারছেনা। মানুষের জীবনের সবথেকে বড় ভয় হচ্ছে বেঁচে থাকার ভয়, অভাব মানুষকে যেমন বাঁচতে শিখায় তেমনি জীবনকে কিভাবে শত কষ্টের মধ্যেও কিভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে। জীবন সংগ্রাম কখনই বয়সের দিক বিবেচনা করে আসে না।
আমার বন্ধু মজনু, মজনুও বহুদিন পর আমি বাড়ি যাচ্ছে, কিন্তু তার আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো না। মজনু জানেনা সে কি করে বাড়ি যাবে কিন্তু সে জানে সে কিছু একটা করবে। এভাবে দিন যেঁতে থাকে, সে প্রতিদিন ভাবতে থাকে কবে সে বাড়ি যাবে, সে মনে মনে নিজেকে বলে এইতো আর কটা দিন তারপর সে বাড়িতে যেঁতে পারবে। বাড়িতে বাবা, মা ও দুইবোন সবাই অধির আগ্রহে পথ চেয়ে বসে আছে। সে খুব কষ্ট নিয়ে আমাকে কথাগুলো বলছিল, “এই দেশে মানুষের আয় বারুক আর নাই বারুক দ্রব্যমূল্যের দাম ঠিকই হুর হুর করে বারে, দেশ নাকি শুধু উন্নয়ন হয় কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন তো চোখে পরে না, দিন যায় আর জীবনযাত্রার মান সুধু নিচেই নামে।”
তার কথাগুলো শুনে মনে হলো মানুষের জীবনে উন্নয়ন হবে তখনি যখন মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ হবে অন্যথা তাদের কাছে সব উন্নয়নই মূল্যহীন। রাজবাড়ির বাসে উঠে মনে হচ্ছিল কোন রেসিং কারে উঠেছি, বাস চালক যেভাবে গাড়ি চালাচ্ছে মনে হচ্ছে এক ঘন্টার মধ্যেই পৌছে যাবো, সাথে যে পরিমান ঝাকি খাচ্ছি শেষ পর্যন্ত পশ্চাৎদেশের হারগুলোই না ভেঙে যায়। কি আপনারা কি ভাবছেন আমি সত্যিই এক ঘন্টাই পৌছে গিয়েছি, আরে ভাই এটা বাংলাদেশ, আরিচা ঘাটের জ্যামের কথা কার না জানা, একবার যদি ফাসেন আজীবন চাইলেও ভুলবেন না। গরমে অতিষ্ট হয়ে শেষমেশ বাস থেকে নামলাম দেখি কয়েক কি.মি. শুধু বাস আর ট্রাকের লম্বা লাইন। এক ঘন্টা যাবত আমাদের রেসিং কার এক ইঞ্চিও নরে নাই, সময় যাচ্ছে আর ধৈযের বাধ ভেঙ্গে চৌচির হচ্ছে। একে তো গরম তার মধ্যে বাচ্চাকাচ্চার তীব্র ক্রন্দন সব মিলিয়ে বেসম্ভব পরিস্থিতি, অবশেষে ফেরির দেখা মিললো, দৌলতদিয়া ঘাত থেকে পাটুরিয়া ঘাটে যেতে সময় লাগে মাএ ৩০ মিনিট, কিন্তু দৌলতদিয়া ঘাট থেকে পাটুরিয়া ঘাট পার হয়ে মূল সড়কে যেতে সময় লাগে ৩-৪ ঘন্টা কখনো আবার ৫-৬ ঘন্টা এ যেন এক মহা যজ্ঞ।
রাজবাড়ির কথা বললে দুটো জিনিসের কথা না বললেই নই এক হল রাজবাড়ির সহজ সরল মানুষ আর হলো রাজবাড়ির বিখ্যাত চমচম! রাজবাড়িতে যেইবার প্রথমবারের মত যাওয়া হয়েছিল সেবার কম হলেও ২-৩ কেজি চমচম তো নিজেই খেয়ে সাবার করেছি। রাজবাড়ির আর একটা বেপার আমার কাছে ভাল লেগেছে সেটা হলো রাজবাড়ি সদরে মনেই হয় না যে এটা ঢাকার বাহিরে এসেছি। সবকিছুর মধ্যে একটা ঢাকার ছোয়া আছে। রাজবাড়িতে কালিবাড়ির দই আর কুলফি মালাই এর সাধ এক কথাই অসাধারন। এই প্রচন্ড গরমে এক কাপ কালিবাড়ির দই সাথে কুলফিওলার কুলফি বলতেই জিহবাই পানি চলে এসেছে।
অতঃপর ফেরিতে, ফেরিতে উঠে আমি সব সময়ের মত ফেরির তিন তলাই উঠে বাতাস খাচ্ছি, হঠাৎ পায়ের কাছে চোখ পড়ল, কে জেনো আমার পায়ের জুতা ধরে টানাটানি করছে, আমি তারাহুরো করে সরে গেলাম, দেখি লোকটা ব্রাস নিয়ে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে আর কাঁধের বাক্সটা নামিয়ে বলল স্যার আমি গরিব মানুষ আপনার জুতোটা পরিস্কার করে দেয়, আমি ওদের এরকম আচরনের সাথে পরিচত, তাই বললাম ২০ টাকার বেশি আমি দিতে পারবনা যদি রাজি থাকো তাহলে আমি আমার জুতা দিব, সে রাজি হলো কিন্তু পরক্ষণে যা ঘটলো তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না লোকটা জুতা জোড়া মুছা শেষ করে আমার কাছে ৫০ টাকা দাবি করে বসলো, আমি কিছুক্ষন তাকে বুঝালাম কিন্তু সে বুঝতে নারাজ, আমার ঠিক পাশের বেঞ্চে যে লোকটা বসেছিল সে এসব দেখে এগিয়ে আসলো আর এসেই মুছিওয়ালাকে ধ্মক দিল সে পরে বিপদ দেখে ২০ টাকা টা নিয়ে দ্রুত কেটে পড়ল ওই জাইগা থেকে…।