একজন বৃদ্ধা মায়ের করুণ কাহিনী।

Words
912
Reading
5 min
Listen
Play
5y

আসালামুআলাইকুম,
20210716_213545.jpghttps://picsart.com/i/179341077000202
পৃথিবীতে মা শব্দটি মধুর শব্দ, শব্দটির মধ্যে যেন হাজার ভালোবাসা ভরে আছে। একটা মা তার সন্তানকে গর্ভধারণ থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত,অনেক বড় ভূমিকা পালন করে থাকে।আর সন্তানকে বড় করে তুলতে হাজার ত্যাগ তিতিক্ষা শিকার হয় একটি মা। পৃথিবীর হাজারো ঝড়ঝাপটা মধ্যে নিজের সন্তানকে আগলে রাখে পরম ভালোবাসায়।

কিন্তু সন্তানেরা মায়ের সেই ভালোবাসার কতটা মূল্য দিতে পারে না।

তেমনি ঘটেছে মাজেদা খাতুনের জীবনে।

মাজেদা খালাকে আমি চিনি ছোটবেলা থেকে। ছোটবেলায় মাজেদা খালা কে দেখেছিলাম,তিনি ছিলেন অসাধারণ সুন্দরী। মাজেদা খালার গায়ের রং ছিল যেন দুধে-আলতা, এত সুন্দরী ছিলেন তিনি। কিন্তু মাজেদা খালার জীবনটা ছিল অনেক দুঃখের।

এইতো কয়েকদিন হল মাজেদা খালার সাথে আমার দেখা হয়েছে হাসপাতালে । তিনি খুব অসুস্থ তাকে দেখতে হসপিটালে গিয়েছিলাম। খালার ছেলে মেয়ের জন্য অনেক কষ্ট করেছে জীবনে। মাজেদা খালার তিনজন ছেলে মেয়ে। ছেলে মেয়ে ছোট থাকা অবস্থায় খালার স্বামী মারা যায়। স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলেমেয়েদের নিয়ে অনেক কষ্টের পড়ে যায় খালা।খালার স্বামী মারা যাওয়ার পর খালার বাবা-মা চেয়েছিলেন' খালাকে বিয়ে দিতে খালা ছেলে-মেয়ের চিন্তা করে বিয়ে বসেনি জীবনে। বাবা-মা বিয়ের জন্য চাপ দিত বলে,বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়িতে চলে আসেন।

ওনার জীবনটা কাটিয়ে দিলেন ছেলে মেয়ের জন্য। খালার জীবনের শুরু হয় নতুন যুদ্ধ শ্বশুরবাড়িতে এসে।কিছুদিন শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাকে এবং তার সন্তানদের সব রকমের সাহায্য সহযোগিতা করেছে।তারপর থেকে সবাই বলে আমরা আপনার এবং আপনার সন্তানদের সাহায্য করতে পারব না।আপনি নিজে চেষ্টা করেন না হলে বাবার বাড়িতে চলে যান।

খালা তাদের কথা শুনে চোখে মুখে অন্ধকার দেখতে লাগল। কারণ খালার 2 মেয়ে একটির 13 বছর আরেকটি 10 বছরের ছেলে মাত্র চার বছরের। কারো চাকরির বয়স এখনো হয়নি,তার সংসার চালাবে এমন কেউ নেই।

তখন খালা চিন্তা করেন খালা নিজেই কিছু করবে। তাই প্রথমে গ্রামে যার বাড়িতে কাজ পেত তার বাড়ীতে কাজ করত। তারপর যখন ধান কাটার সময় হতো,তখন ধান কাটা, ধান নেওয়া থেকে ধান শুকানো পর্যন্ত কাজ করতেন। আর যাদের বাড়িতে কাজ করতেন তারা তিন বেলা খাওয়া দাওয়াত দিতেন। এর পর খুশি হয়ে চাল এবং কিছু টাকা পয়সা দিতেন এভাবে খালার সংসার চলত।

খালা মানুষের কাজ করে মেয়েদের মোটামুটি পড়ালেখা করান,তারপর মেয়েদের বিয়ে দেন।খালার ছেলেকেও পড়ালেখা করিয়েছে,ছেলের যখন 17 বছর হলো তখন একজন মানুষ খালাকে বলে।ছেলে তো বড় হয়েছে ছেলেকে চাকরি দেন না হলে বিদেশে পাঠিয়ে দেন।

তখন খালা ঐ লোকটিকে হাতে-পায়ে ধরে,ছেলেকে কোনরকমে টাকা পয়সা জোগাড় করে বিদেশে পাঠিয়ে দেন। ছেলে বিদেশে যাওয়ার পর মানুষের ঘরে কাজ করা বন্ধ করে দেয় খালা।ভালোই চলছিল মাজেদা খালার ঘর, তবে মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে,ছেলে বিদেশে থাকে খালা ঘরে একেবারে একা থাকে।

সবাই বলে জীবনে তো অনেক কষ্ট করেছ,এবার একটা ছেলের বউ ঘরে নিয়ে আস।তারপর খাবে আর নামাজ পড়বে তোমার কোন কাজ করতে হবে না। তখন মাজেদা খালা চিন্তা করলেন ছেলের আসলে বয়স হয়েছে। বিয়ে তো করাতে হবে এবার দেশে আসলে ছেলেকে বিয়ে করাবো।

কিন্তুু খালার এই সুখের চিন্তাটা যেন আল্লাহ বেশিদিন সহ্য করলো না।ছেলে দেশে আসার পর ছেলেকে বিয়ে করালেন, ছেলের বউ ছিল খুবই সুন্দরী।ছেলে বিয়ে করে বউকে মায়ের কাছে রেখে বিদেশে চলে যায়। ছেলে বিদেশ যাওয়ার পর মাজেদা খালার নামে উল্টাপাল্টা কথা বলা শুরু করে, ছেলের কাছে ছেলের বউ।

এই উল্টোপাল্টা মিথ্যা কথা বলতে বলতে ছেলেকে মাজেদা খারলার কাছ থেকে আলাদা করে ফেলে বউ। ছেলে সবসময় বউয়ের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করত কিন্তু মাজেদা খালার সাথে কোন যোগাযোগ করত না। এভাবে দেশে আসে যায় দেশ থেকেও মায়ের কোন খোঁজ খবর রাখো না। ছেলের বউ এই সুযোগে মাজেদা খালার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করত।

মাজেদা খালা এসব সহ্য করতে পারত না,তাই কয়েকদিন পরপর মেয়েদের বাড়িতে চলে যেত।আর ঘরে থাকলেও বউ, নাতি,নাতনি কথা বলত না। সারাদিন বাইরে বাইরে থাকতো,খাবারের সময় হলে ঘরে যেত এক মুট খাবারের জন্য।তখন অনেক বকাঝকা করত বউ। সারাদিন বাইরে থাকেন খাবারের সময় হলে চলে আসেন,এই খবরটা তো ঠিকই রাখেন খাবার যে খেতে হবে?

মাজেদা খালা কানে শুনতেন না,আর যাই শুনতেন শুনে কোন উত্তর দিতে না শুধু চোখের পানিগুলো ফেলতেন। মাজেদা খালার সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছিল, তখন যখন উনার সম্পত্তি ওনার ছেলের নামে করে দিয়েছে।তখন থেকে বউ নাতি-নাতনিদের অত্যাচারে পরিমাণ বেড়ে গেছে।

শুনেছি ছেলের বউ ছেলে খারাপ হলেও নাতি-নাতনিরা দাদিকে অনেক ভালোবাসে। কিন্তু মাজেদা খালার ক্ষেত্রে হয়েছে তার উল্টোটা, তাহাকে নাতি-নাতনিরা পর্যন্ত পছন্দ করত না।মাজেদা খালা মন ছোট করে রাখত আর মনে হয় সবসময় চিন্তায় ভিতরে থাকতো। এক বেলা খেলে আরেক বেলা খেতে পারতো না।মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের কথা বলতেন অনেকে অনেক পরামর্শ দিত,ছেলে জন্য এটা করো,ওটা করো কিন্তু কখনো মাজেদা খালা ছেলের নামে কোন কিছু করে নাই, কোন নালিশও কখনো করেনি।

কারণ মাজেদা খালা তার ছেলেমেয়েকে প্রচুর ভালবাসে। তাদের জন্য তার পুরোটা জীবন শেষ করে দিয়েছে, সবসময় মাজেদা খালা এই কথাটাই বলতো।মাজেদা খালা ছেলে ছেলের বউয়ের অত্যাচার সহ্য করত না পেরে, স্টক করে মেয়ের বাড়িতে।

মাজেদার খালার অবস্থা খুবই খারাপ ছেলের সাথে কোন যোগাযোগ নেই, অন্য মানুষকে দিয়ে ছেলের কাছে খবর পাঠিয়েছে করেছে। ছেলে শুনে ছেলের বউকে বলে মায়ে স্টক করেছে, তখন ছেলের বউ বলে আমাদেরকে খবর শুনাইছে কি জন্য? আমরা জানিনা আমাদের থেকে টাকা নেওয়ার জন্য।

ছেলের বউ একবারও চিন্তা করলো না,মাজেদা খালা তার ছেলেমেয়েকে কত কষ্ট করে এত বড় করেছে?
আর ছেলে বা কেমন মায়ের ঐ কষ্টের কথা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গিয়েছে?
এটাই সত্যি মায়ের মত ভাল আমরা কখনো বাসতে পারব না, কিন্তু মা তার সন্তানকে সারাজীবন ভালবাসবে যুগ যুগান্তর ।

মাজেদা খালা হয়তো আর বেশীদিন বাঁচবে না, তারপরও তার মৃত্যুর আগে আমি চাই।তার ছেলে যেন তাকে তার মত করে ভালোবাসে। যেমন ছোটবেলায় খালা তার ছেলেকে ভালোবাসতেন,তার ছেলে মেয়ের জন্য সুন্দর জীবনের টুকু সময় শেষ করে দিয়েছেন।

যে ছেলে মেয়ের জন্য তিনি বিয়ে বসে নেই, সে ছেলে মেয়ে যদি এরকম কষ্ট দেয়,তাহলে কোন মায়ের পক্ষে কি সহ্য করার সম্ভব? আপনারাই বলেন।

মাজেদা খালার মত অনেক মায়ের জীবনে এই করুণ কাহিনী রয়েছে। সব সময় দোয়া করি সব মায়েরা যেন ভালো থাকে, সব মায়েরা যেন তার সন্তানদের নিয়ে সুখী হতে পারে।

ধন্যবাদ, আমার পোষ্ট আপনারা এতক্ষণ ধৈর্য ধরে পড়ার জন্য।

একজন বৃদ্ধা মায়ের করুণ কাহিনী। | Ecency