আসালামুআলাইকুম,
মায়ের অবদান আমরা বলে শেষ করতে পারবো না।আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে দেখতে গেলে মায়ের অবদান,মাত্রই অনস্বীকার্য নয় বলতে গেলে মা আমাদের জীবন। ছোটবেলা থেকে বড় হওয়া অব্দি মায়ের অবদান প্রতিটা ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জীবনে যখনই হতাশ, ক্লান্তি,একাকীত্বতা আমাদের ঘিরে রাখতে চেয়েছিল, তখনই মা রুখে দাঁড়িয়েছে।
মা তার জীবন দিয়ে সন্তানদেরকে ভালোবাসতে চাই।
মায়ের অবদান বলে শেষ করা যাবে না আমাদের।
তেমনি একটি ঘটনার কথা আপনাদের সাথে শেয়ার করব।
আমার পরিচিত রহিমা বেগম, তিনি ছিলেন অত্যন্ত গরীব তার সংসারে তিনটি ছেলে মেয়ে স্বামী আছে,কিন্তু রহিমা বেগমের স্বামী থেকেও না থাকার মতো,কারণ তার স্বামী একটি দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করে।তিনটি ছেলে-মেয়ে এবং পঙ্গু স্বামীকে নিয়ে কষ্টে দিন কাটত রহিমা বেগমের।
অভাবের সংসারে কোনরকমে দিন যাপন করত,রহিমা এবং তার পরিবারের সদস্যরা। তার স্বামী পঙ্গু হওয়ার পর থেকে খুব চিন্তায় ছিলেন, কিভাবে সংসার চালাবে এবং
কিভাবে পঙ্গু স্বামীর চিকিৎসা করবে।তাই রহিমা বেগম তার ছেলে এবং মেয়ে কে নিয়ে গ্রামের মানুষের কৃষি ক্ষেতের কাজ শুরু করে দিলেন।
রহিমা বেগমের এই কাজ দেখে গ্রামের মানুষ অনেক ঠাট্টা বিব্রত করত রহিমা বেগমকে,তিনি কখনো কাজকে ছোট মনে করেননি।তিনি কাজকে সম্মান করতেন কারণ কাজ করে তিনি ইনকাম করছেন, তিনি চুরি করছেন না। রহিমা বেগম গ্রামের মানুষের কথা কখনো পাত্তা দিতেন না, আর এগুলো নিয়ে কখনো চিন্তা করতেন না,তিনি তার মত কাজ করতেন।
সংসার তো চালাতে হবে, ছেলে-মেয়ের ভরণ-পোষণ এবং স্বামীর চিকিৎসা কথা,সব সময় রহিমা বেগম মাথায় রাখতেন। তবে রহিমা বেগম ছিলেন খুবই অসহায় একটি মহিলা। আর অসহায় বলে গ্রামের মানুষেরা রহিমা বেগম এবং তার ছেলেমেয়েদের কে দিয়ে,সারাদিন কাজ করা তো।সকালবেলা রহিমা বেগম তার ছেলেমেয়েকে নিয়ে কাজে যেতেন,সন্ধ্যা ছয়টায় এসে ঘরে ঢুকছেন।
সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করতেন, অনেক সময় দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করলে করতেন, আবার না খেয়ে ঘরে ফিরে আসতেন ছেলে মেয়েকে নিয়ে।তারপরও সততার সাথে কাজ করেছেন রহিমা বেগম। রহিমা বেগমের ছোট মেয়ে নীলিমা, বয়স 13-14 বছর চলে, মায়ের এই কষ্ট দেখে নীলিমা মনে মনে চিন্তা করে,আমি যদি কোন কিছু করতে পারতাম সংসারের জন্য, সব সময় এই আক্ষেপ করতেন নীলিমা।
নীলিমা চাইত ভালো একটা চাকরি করবে,সে চাকরি করে তার মা, ভাই-বোনের কষ্টের কাজ গুলো বন্ধ করে দিবে।আর তার চাকরির জন্য তার মা-বাবা ভাই-বোন কে সবাই সম্মান করবে এই চিন্তায় সবসময় করতেন। নীলিমা কতটুকুইবা বয়স হয়েছে সে ভালো চাকরি করবে?নীলিমা পড়ালেখা করেনি তাহলে কিভাবে ভাল চাকরি করবে।
কিন্তু এই কথাটি মানতে নারাজ লিলিমা,প্রায় পাশের গ্রামের মাসুদের সাথে লিলিমার কথা হতো,মাসুদ বিভিন্ন সময়ে নীলিমাকে প্রলোভন দেখাতো,
পড়ালেখা না হলে কি হবে?তোমার মতো মেয়েরা ঢাকা শহরে হাজার হাজার টাকা কামাচ্ছে ভালো ভালো চাকরি করতেছে। তুমি চাইলে ভালো চাকরি করতে পারো, তোমার মা ভাই-বোনের মত সারাদিন এরকম কঠোর পরিশ্রম করতে হবে না তোমাকে।
নীলিমা এসব কথা শুনে লিলিমা একসময় রাজি হয়ে যায়, মাসুদের সাথে ঢাকা শহরে যাবে,ওখানে গিয়ে ভালো একটা চাকরি করবে এই চাকরি টাকা দিয়ে তার সংসার চলবে। তার মা ভাই-বোন কঠোর পরিশ্রম করা থেকে বন্ধ করে দিবে। যেই কথা সেই কাজ নীলিমা কাউকে না বলে মাসুদের সাথে ঢাকা শহরে চলে গেলেন।
নীলিমার মা কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় ঘরে এসে দেখে, নীলিমা ঘরে নেই।নীলিমাকে খুঁজতে খুঁজতে নীলিমার মা সারা রাত পার করে দিয়েছে,কিন্তু নীলিমাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সকালবেলা লিলিমার শুনতে পায়, একজন থেকে নীলিমা পাশের গ্রামের মাসুদের সাথে কোথায় যেন চলে গিয়েছে। তারপর থেকে লিলিমার মা অনেক খোঁজাখুঁজি করেছে,কিন্তু নীলিমার কোন খোজ খবর পায়নি।তিন বছর কেটে গিয়েছে লিলিমাকে খুঁজে পাইনি।
নীলিমার পরিবার ছিল হতদরিদ্র,তাই তারা পুলিশের কাছে যায়নি। গ্রামের ভিতরে অনেক হুজুরের কাছে গিয়েছে, অনেক তদবির করেছে,কোন কাজই হয়নি।তারপর রহিমা এবং তার বড় মেয়ে কাঠ কেটে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে আসার সময় মাসুদকে রহিমা দেখতে পাই। তখন বড় মেয়েকে জিজ্ঞেস করে এটা কি মাসুদ নাকি?দেখতো।
বড় মেয়ে মাসুদকে দেখে চিনে ফেলে, তখন মাকে বলে হা মা মাসুদি তখন রহিমা তার মাথার থেকে লাকড়ি ফেলে দিয়ে মাসুদ কে ধরার জন্য মা মেয়ে দৌড়ে যাই।দৌড়ে গিয়ে মাসুদকে ধরে মাসুদকে জিজ্ঞেস করে তার মেয়ে কোথায় আছে?মাসুদ বলে আমি জানিনা আপনার মেয়ে কোথায় এভাবে অনেক তর্ক বিতর্ক হয়, একসময় মাসুদকে গ্রামের মানুষ ধরে উত্তম-মধ্যম দেয়।
তখন মাসুদ স্বীকার করে নীলিমাকে সে নিয়ে গেছে।আর নিয়ে গিয়ে একটা এজেন্টের কাছে বিক্রি করে দেয়,সেই এজেন্ট একটি ঘরে কাজের মেয়ে হিসেবে তাকে বিক্রি করে দেয়। এজেন্টের ঠিকানা মাসুদের থেকে নিয়ে, তারপর রহিমা বেগম তার ছেলেকে নিয়ে আর ঠিকানা নিয়ে ছুটে চলেন ঢাকা শহরে, কিন্তু রহিমা বেগম ঢাকা শহরে কোন কিছুই চিনে না,তাঁর সন্তানের জন্য তার প্রতিটি রক্তকণা খরচ করতে তিনি দ্বিধাবোধ করছে না।
রহিমা বেগম ঢাকা শহরে এসে তার সবকিছু যেন অপরিচিত, অচেনা-অজানা লাগছিল। তারপর ছেলেকে নিয়ে ঠিকানা মত ওই এজেন্টের কাছে যাই,এজেন্টের কাছে জিজ্ঞেস করে একটি মেয়ে মাসুদ এনেছে নাম তার নীলিমা এই মেয়েটিকে কার ঘরে আপনি কাজে দিয়েছেন?
এজেন্ট ওয়ালা বলতে নারাজ নীলিমাকে চিনেন না, আর সেই কথাটা বারবার তার মাকে বোঝাতে যাচ্ছে,কিন্তু মায়ের মন বলেত একটি কথা আছে না, লোকটি মিথ্যা কথা বলছে রহিমা বেগমের কেন যেন বারবার মনে হচ্ছিলো।এদিকে রহিমা বেগম গ্রামের থেকে আসার সময় যে টাকা নিয়ে এসেছিলেন, সে টাকা ফুরিয়ে গেল।
তাই আবার রহিমা বেগম গ্রামে চলে যাই,অনেক দিন পরিশ্রম করে গ্রামে কাজ করে আর এই পরিশ্রমের টাকা জমিয়ে আবার ঢাকায় চলে আসে।আবার এসে এজেন্টের লোকটির সাথে কথা বলে,এজেন্টের লোকটি উনার কথা শুনতে নারাজ, এজেন্টের লোক গরম হয়ে বলে আমি এখনি পুলিশকে খবর দিব, তখন রহিমা বেগম বলে ঠিক আছে পুলিশকে খবর দেন।
তাহলে তো আরো ভালো হবে আমার মেয়েকে আমি আরো তাড়াতাড়ি পেয়ে যাব,একথা শুনে এজেন্ট লোকটি খুব ভয় পেয়ে যায়,তখন রহিমা বেগম কে তার মেয়ের ঠিকানা দেয়।মেয়েকে বিক্রি করে দিয়েছে কাজে মেয়ে হিসেবে সেইটাও বলে।
তবে নীলিমাকে যে ঘরে কাজের মেয়ে হিসেবে বিক্রি করেছে, সেই ঘরে নীলিমাকে প্রচন্ড রকমের অত্যাচার সহ্য করতে হতো,যার ঘরে নীলিমা কাজ করছে সেই মহিলাটি খুবই খারাপ একটি মহিলা, প্রতিনিয়ত নীলিমাকে অত্যাচার করতো,কাজে ভুল হলে প্রচন্ড রকমের মারধর করতো।
রহিমা বেগমের ঢাকায় কোন পরিচিত মানুষ নেই, তাই এক রিক্সাওয়ালার সহযোগিতায় ঠিকানা মত গেলেন তার মেয়েকে ফিরিয়ে আনার জন্য,কিন্তু পারেনি কারণ দারোয়ান তাদেরকে দেখে গেটের সামনে থেকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। গেটের বাইরে অনেক ডাকাডাকি করেছেন লিলিমাকে, কিন্তু নীলিমার কানে সেই মমতাময়ী মায়ের ডাক পৌঁছয়নি।
বারবার অনুরোধ করেছে দারোয়ানকে ঘরে যাওয়ার জন্য কিন্তু দারোয়ান তাদের পাত্তা দেয়নি, তাই রহিমা বেগম নিরুপায় হয়ে পুলিশ স্টেশনে যায়, পুলিশ স্টেশনে গিয়ে তার সব কথা খুলে বলে। প্রথমে পুলিশও তাদের কথা পাত্তা দেয়নি, কারণ যেই ঘরের লিলিমাকে কাজ করতে দিয়েছে, সেই ঘরের মালিক অনেক পয়সাওয়ালা তাই পুলিশকেও তারা কিনে নিয়েছে।
রহিমা বেগম থানায় ঘুরতে ঘুরতে তার দিন যাচ্ছে রাত যাচ্ছে,তার মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছে না।একদিন পুলিশের বড় অফিসারকে দেখে তার সব কথা খুলে বলে এবং রহিমা বেগম পুলিশের পায়ে ধরে কান্না শুরু করে, তখন পুলিশে বলে আচ্ছা ঠিক আছে,আমি দেখবো এবং আপনার মেয়েকে আমরা উদ্ধার করবই।
অনেক দিন চেষ্টার পর লিলিমাকে উদ্ধার করে,তার মায়ের বুকে ফিরিয়ে দেয়, তিন বছর আগে হারিয়ে যাওয়া লিমাকে দেখে তার মা পাগলের মত হয়ে যায়। লিলিমাকে পেয়ে আত্মহারা হয়ে যায় খুশিতে তার বোন।
নিলিমার মায়ের চেষ্টায় লিলিমাকে ফিরে পেয়েছে এবং লিলিমা জীবনের অন্ধকার দিন থেকে বেঁচে ফিরে তার বাবা-মায়ের সাথে সুখে শান্তিতে আছে।
এইভাবে নীলিমার মত হাজারো লিলিমা হারিয়ে যাচ্ছে,হয়তো কিছু নীলিমার মত তাদের পরিবারের খুজে পাচ্ছে । আর হয়তো কারো খোঁজ খবর পাওয়া যায়নি। এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে তার আদরের সন্তান এরা।
ধন্যবাদ, এতক্ষণ ধৈর্য ধরে আমার পোস্টটি পড়ার জন্য।