দিনমজুর বাবা কি তার মেয়ের হত্যার বিচার পাবে? (শেষ পর্ব)

Words
968
Reading
5 min
Listen
Play
5y

আসসালামু আলাইকুম,
20210731_004211.jpg
https://picsart.com/i/190406854003202

বান্ধবীদের কথাই যেন সত্যি হয়েছে, রাবেয়ার ভাই এবং তার বান্ধবীরা ওই জায়গায় গিয়েছে।
কিন্তু কি আজব রাবেয়াকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
তাই রাবেয়ার ভাই তার বাবার কাছে ছুটে চলেছে বাবাকে জানাতে রাবেয়াকে যাচ্ছে না।রাবেয়ার ভাইয়ের থেকে শুনে তার বাবা এবং গ্রামবাসী সারারাত ঘন জঙ্গলে খুঁজে বেড়িয়েছে, কিন্তু রাবেয়াকে কোথাও খুঁজে পাইনি।

তখন গ্রামের কিছু মানুষ বলছে রাবেয়ার বাবাকে পুলিশের কাছে যেতে, কিন্তু অত্যাচারী মোড়ল যেতে বাধা দেয়।
আর মোড়লে বলে যদি তোমরা পুলিশ স্টেশনে যাও তাহলে এই গ্রাম ছাড়া হবে।তাই সারারাত রফিকুল মিয়া আদরের মেয়ের জন্য ছটফট কতে থাকে। এটাই স্বাভাবিক বাবা মায়ের জন্য, সন্তান যদি ঘরের বাইরে থাকে তার বাবা-মা এরকমই ছটফট করবে। কিন্তু রফিক মিয়া জানে তার মেয়েকে অত্যাচারী মোড়লের ছেলে সুমন তুলে নিয়ে গেছে।

তাহলে কিভাবে একটা বাবা শান্তিতে ঘুমাতে পারে?
সকলে খবর আসে রাবেয়ার ক্ষত-বিক্ষত লাশ জঙ্গলের মধ্যে পড়ে আছে, একথা শুনে রফিকুল মিয়া পাগলের মতো ছুটে যাই। গিয়ে মেয়ের ক্ষত-বিক্ষত লাশ দেখে অঝোরে কান্না শুরু করে দেয়, রাবেয়ার হত্যার খবর অলিনগর থানার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। থানা থেকে পুলিশ আসে আর গ্রামের মোড়ল পুলিশকে কিছু টাকা দিয়ে বলে এই হত্যার ব্যাপারটা শেষ করে দিতে কিন্তু পুলিশ তা করেনি। সেই পুলিশ রাবেয়ার ক্ষত-বিক্ষত লাশ এবং দিনমজুর রফিকুল মিয়া কে দেখে তার অনেক মায়া হয়।

তাই সেই পুলিশ অফিসার মোড়লকে বলে আমি এই অবিচার করতে পারব না, এই হত্যা আপনার ছেলে করেছে তাই না?
তখন মোড়ল বলে ছেলে মানুষ একটা দুইটা খুন করতে পারে এটা কোন ব্যাপার না। মোড়লের অত্যাচারিত কথা শুনে পুলিশ অফিসার ক্ষেপে যায়, তখন মোড়লকে বলে আপনার ছেলে হত্যা করেছে, অবশ্যই আপনার ছেলেকে আমি শাস্তির ব্যবস্থা করব।

তখন গ্রামের মোড়ল সাহেব একটু ভয় পেয়ে যায়, তবে পক্ষান্তরে ভয়টা কেটে যায়,তার সাথে ক্ষমতাবান দলের কিছু লোক আছে তার বন্ধু, তারা তাকে উৎসাহিত করে তোমার ছেলে এরকম ছোটখাটো অপরাধ করছে সেটা নিয়ে তুমি ভয় পাচ্ছ?প্রয়োজনে হলে এই পুলিশকে থানা থেকে অন্য থানায় বিদায় করে দিব,তোমার ছেলেকে নিয়ে কোন চিন্তা করতে হবে না।

তাদের কথা শুনে একটু সাহস পাই মোড়ল সাহেব, তখন পুলি এসে মোড়লের ছেলে সুমন কে ধরে নিয়ে যায় থানায়।
তবে মোড়লের ছেলে সুমনের বিন্দু পরিমাণ ভয় ছিল না,তাকে স্বাভাবিক দেখতে লাগছিল কারন সে মনে করছে, তার বাবা একজন গ্রামের মোড়ল তার বাবার সাথে দলের ক্ষমতাবান লোকের আছে তাকে কিছুই করতে পারবেনা পুলিশ। মোড়লের ছেলে সুমনের ধারণাটা কি ঠিক ছিল সুমনকে বেশিদিন জেলে আটকে রাখতে পারেনি।

মোড়লের ছেলে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আবার রফিকুল মিয়া এবং তার ছেলেদের উপর অত্যাচার শুরু করে,অত্যাচারের শেষ সীমায় চলে গিয়েছে। রফিক মিয়াকে যারা যারা সহযোগিতা করেছিল,তাদের উপরেও অত্যাচার শুরু হয়ে যায় মোড়লের ছেলে সুমনের। অত্যাচারে অসহ্য হয়ে গ্রামের মানুষ ওই পুলিশ অফিসারের কাছে যাই।

অফিসার গ্রামের মানুষ এবং রফিকুল মিয়ার কথা শুনে তাঁর মনে মায়া হয়। তখন নতুন করে আবার তদন্ত শুরু করে আসলেই রাবেয়া রাবেয়া কে হত্যা করেছে, কারণ প্রথমবার যখন সুমনকে ধরে নিয়ে এসেছিল থানায়, তখন মিথ্যা সাক্ষী সাজিয়ে সুমনকে নির্দোষ বানিয়ে জেল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।পুলিশ এখন তা হতে দিবে না,সব রকমের সাক্ষী প্রমাণ নিয়ে পুলিশ সুমনকে ধরে আনে।

রাবেয়াকে হত্যা করার আগে ধর্ষণ করা হয়েছিল,সেই রিপোর্ট এসেছে। রাবেয়াকে হত্যার সময় যেই অস্ত্র ব্যবহার করেছিল, সে অস্ত্রটা পুলিশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। দ্বিতীয়বার যখন সুমনকে জেলখানায় নিয়ে যায়, তখন গ্রামের মোড়ল রাবেয়ার বাবাকে প্রচন্ডরকম মারধর করেছে এবং গ্রামে যত রকমের বাজারে দোকান আছে, সব দোকানদার কে মোড়ল বলে দেয় রফিকুল মিয়ার কাছে কোনো পণ্য কেউ বিক্রি করলে সেই দোকানদার কে গ্রামের থেকে বের করে দেওয়া হবে।

সব দোকানদার ভয় পেয়ে রফিকুল মিয়া কে কোন রকমের বাজার সাজার দিত না। এভাবে করে অনেক দিন কেটে যায়। রফিকুল মিয়ার দুই অবুঝ ছেলে খিদের জ্বালায় কান্না শুরু করে, তাদের কান্নায় আকাশ বাতাস যেন ভারী হয়ে এসেছে।
আমাদের সমাজে দিনমজুর গরিব মানুষ গুলোর কোন মূল্য নাই কেন?
এই সমাজের মানুষগুলো ধনী মানুষের অন্যায়-অবিচার মুখ বুজে সহ্য করে,তাদের টাকার কারণে তাদেরকে মূল্য দেয়। গরিব মানুষগুলো সেই মূল্য টুকু পায় না এবং সুষ্ঠু বিচার পায় না। বিচারের নামে যেন প্রহসন করা হয়। টাকা দিলে বিচার পাওয়া যায়, মানুষ পাওয়া যায়।

সেই রকমই হয়েছে রফিকুল মিয়ার সাথে,অত্যাচার করা হচ্ছে তার সাথে থাকা দিনমজুররা বুঝতে পারছে, কিন্তু প্রতিবাদ করার সাহস হচ্ছে না।একদিন রফিকুল মিয়া এবং তার সাথে থাকা দিনমজুররা চিন্তা করতে লাগল,এভাবে মোড়ল যদি অত্যাচার করতে থাকে তাহলে আমাদের আর গ্রামে থাকা সম্ভব নয়। তাই আমাদের সবাই মিলে প্রতিবাদ করা দরকার, তানা হলে রাবেয়ার মতো আরো অনেক মেয়েকে জীবন দিতে হবে।

তাই ঠিক করলেন গ্রামে যত দিনমজুর আছে, তারা মোড়লের বাড়িতে কোন কাজ করবে না এবং গ্রামে যত দোকানপাট আছে, তাদেরকে বলা হয়েছে মোড়লের ঘরে কোন খাদ্য সরবরাহ না করার জন্য। রফিকুল মিয়ার কথা সবাই সম্মতি দেয় কারণ গ্রামের মানুষগুলো মোড়লের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে,তাই তারা চাই মোড়লের এই অত্যাচার থেকে পরিত্রাণ পেতে।

যেই কথা সেই কাজ মোড়লের ঘরে খাদ্য সরবরাহ করা বন্ধ করে দিয়েছে, আর এদিকে সুমনে জেল হাজতে জেল খাটছে। মোড়লের ছেলের পক্ষ হয়ে যারা সাক্ষী দিয়েছিল তারা মোড়লের ছেলের বিপক্ষে হয়ে কোর্টে সাক্ষী দিতে রাজি হয়ে গেল। মোড়ল তার গ্রামের মানুষ গুলোকে হাতে রাখার জন্য অনেক রকমের চেষ্টা করে, কিন্তু গ্রামের মানুষরা মোড়লকে হারে হারে চিনি তাই গ্রামের মানুষরা মোড়লের কথায় সায় দেয়নি।

তারপর সুমনকে কোর্টে তোলা হয়,যে সাক্ষী গুলো মোড়লের ছেলের পক্ষে সাক্ষী দিয়েছিল,তারা মোড়লের ছেলে বিপক্ষে সাক্ষী দেয় এবং মোড়লের ছেলে রাবেয়া হত্যা এবং ধর্ষণ করে। মোড়লের ছেলে আদালতকে বলে রাবেয়াকে ধর্ষণ করার পর হত্যা করতে যখন গিয়েছিল, তখন রাবেয়া সুমনের পায়ে ধরে অনেক কান্না করেছে, তার জীবন ভিক্ষা চেয়েছি কিন্তু পাষণ্ড সুমন রাবেয়াকে পৃথিবীতে বাঁচতে দেয়নি তাকে হত্যা করেছে।

আদালত মোড়লের ছেলেকে ফাঁসির আদেশ দেয় এবং মোড়লকে ও শাস্তি দেওয়া হয় নিরহ গ্রামবাসী গরিব দিনমজুরকে দিনের পর দিন অত্যাচার করার জন্য।

রাবেয়ার হত্যা হয়েছে ঠিকই,কিন্তু রাবেয়ার হত্যার মাধ্যমে গ্রামের নিরীহ মানুষগুলো স্বাধীন জীবন ফিরে পেয়েছে।
টাকা ক্ষমতার দাপট বেশিদিন থাকে না,যদি অত্যাচারিত হও তাহলে বেশি দিন রাজত্ব টিকে থাকবে না এটাই সত্যি। আমাদের মেনে নিতে হবে। আমাদের আশেপাশে নিরীহ মানুষগুলোর সাথে খারাপ ব্যবহার না করে, তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করাটাই আমাদের জন্য উত্তম, কারণ তাদের পরিশ্রমের কারনেই আমরা বড় লোকরা আরাম-আয়েশ করছি।

আমাদের সমাজের রাবেয়ার মত হাজার রাবেয়া এভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় হয়ে যাচ্ছে,তাদের যে স্বপ্নগুলো পূরণ হচ্ছে না,তাদের স্বপ্নগুলো অধরা রয়ে যাচ্ছে।

ধন্যবাদ,