বাড়িসহ বাড়ির আশেপাশের চারদিক লাল নীল ঝাড় বাতি দিয়ে আলোক সজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে। বাড়িটা করিম মেম্বারের।করিম মেম্বারের যোগ্যতা বলতে পয়সা আর গোষ্ঠীর জোর দুইটাই আছে । বর্তমানে মেম্বার হওয়ার জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু লাগে না। দুই দিন পর করিম মেম্বারের মেয়ের বিয়ে। তাই বাড়িটা এভাবে সাজানো হয়েছে। মেম্বারের মেয়ের বিয়ে বলে কথা। সবাইকে অন্তত দেখাতে হবে।কত ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছে মেম্বার সাহেব।
যদিও আলোর বিয়েতে মত নেই। তার একটা কারণ হচ্ছে সে সম্প্রতি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগে ভর্তি হবার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তাই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায় ।আর ভবিষ্যতে নিজের নামটা কে আরো আলোকিত করতে চায়।আর অন্য একটি কারণ হচ্ছে ছেলের বয়স প্রায় ৪০ ছুঁই ছুঁই। ছেলে ইতালি প্রবাসী।সারা জীবন টাকার পিছনে ছুটেছে ।এখন বিয়ে করার প্রয়োজন মনে করেছে। তাই একজন ১৯ বছরের মেয়ের বিয়ে ৪০ বছরের বুড়োর সাথে ।এটা মেনে নিতে পারে না আলো ।কারন আলো ১৯ বছরে পা দিয়েছে কয়েক মাস হল।আলো হচ্ছে মেম্বার সাহেব এর একমাত্র মেয়ে।
বিদেশ করলে একটু বয়স হয়ই। তাছাড়া ছেলে ইতালিতে গ্রীন কার্ড পেয়েছে। বিয়ের পর আলোকে নিয়ে যেতে চায় সে দেশে। সেখানে তুই অনেক ভালো থাকবি । এগুলো আলোর বাবার যুক্তি। কিন্তু এখানেই বিবাদ বাদে আলোর তার বাবার সাথে। তার একটি বড় কারন ও আছে।আর সেটা হলো, আলোর বড় দুই ভাই বিদেশে সংসার পেতেছে। তারা এখন আর দেশে তেমন আসে না। মাসে মাসে টাকা পাঠিয়ে দেয়। তাই আলো দেশ এবং আত্মীয়স্বজন ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না । এছাড়াও দেশে কত ভালো ভালো পাত্র আছে। তাই বলে একজন প্রবাসীকে কেন বিয়ে করতে হবে? মানতে চায় না আলো। কিন্তু মেম্বার সাহেব টাকা পয়সা,আর প্রবাসী জামাই পেলে তাতেই খুশি ।মেম্বার সাহেব বলে টাকা হলে বাঘের দুধ ও মেলে। তাছাড়া সে মানুষের কাছে ছেলেমেয়েদের গল্প বলতে পারবেন। টাকার গরম দেখাতে পারবেন। এছাড়া আর কি চাই ? মেম্বার সাহেবের।
কিন্তু আলো পড়াশোনা করতে চায়। দেশে থেকে ও যে সুনাম অর্জন করা যায়,তা প্রমাণ করতে চায় সে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবার।না কোন বয়ফ্রেন্ড এর সাথে নয়। তার এক বান্ধবীর বাসায়। বান্ধবী সব শুনে আশ্বস্ত করেছে, তাকে সহযোগিতা করতে।কারন তার কলেজের এই বান্ধবী ও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য বিভাগে চান্স পেয়েছে। তাই সিদ্ধান্ত মোতাবেক আলো বাড়ি থেকে পালিয়ে গেল, বান্ধবীর বাসায়।আর সেখান থেকে কয়েক দিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে উঠে গেল।
রাস্তাঘাটে, পাড়ার প্রতিটি দোকানে, পুরো গ্রাম এমনকি বাজার পর্যন্ত কুৎসা রটনা হল , মেম্বারের মেয়ে কোন এক ছেলের সাথে পালিয়ে গেছে। মেম্বারের মুখ দেখানোর মত আর অবস্হা থাকল না । বাড়ির বাইরে কি হচ্ছে সবই খবর পায়। যদিও সামনে বলার ক্ষমতা কারোর নেই। তাই মেম্বার আলোর মাকে শাসিয়ে বলল,এই মেয়ের জন্য এ বাড়ির দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ।কোন দিন যেন এই মেয়ের নাম মুখে না আসে। আলোর মা নিরবে চোখের জল মুছে, আর বলে আমার মেয়েকে আমি চিনি। সে কোন ছেলের সাথে পালিয়ে যায় নি।
কারন মেয়েরা সম্পর্কে জড়ালে সর্বপ্রথম মায়েরা টের পায়। যদিও আলোর বাবা জানে তার মেয়ে এমন নয় । তারপর ও তার মুখে চুনকালি মেখে যাওয়াটা মেনে নিতে পারেনি।
আলো সবই শুনল মায়ের কাছ থেকে। যদিও লুকিয়ে লুকিয়ে মেয়ের সাথে ফোনে কথা বলে আলোর মা । কারন মেম্বার সাহেব মেয়ের নাম শুনলেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। এবার আলো পড়াশোনার মধ্যে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে দিল। কিছু জমানো টাকা আর বড় আপুদের ম্যানেজ করে দুইটা টিউশনি দিয়ে চলতে থাকলো সে । দিনের বেলায় পত্র পত্রিকা আর বিভিন্ন চাকরির বই আর রাতে শুধু একাডেমিক পড়ায় ব্যাস্ত হয়ে পড়ল সে । অনেক বান্ধবী আর আপুরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। কিন্তু সে বুঝে ও না বুঝার ভান করত। সেগুলোই তাকে তার পড়াশোনায় আরও বেশি মনোযোগী করত।
এভাবে সে সিজিপিএ ৩ এর একটু উপরে পেয়ে অনার্স শেষ করল।এম.এ ভর্তি হয়েই পুরোপুরি চাকরির প্রতিযোগিতায় নেমে গেল সে । অনার্স ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা দিয়েই বিসিএস এ আবেদন করেছিল সে । কয়েক মাস পরেই প্রিলিমিনারি,তারও কয়েক মাস পর লিখিত পরীক্ষায় টিকে গেলো সে।যারা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত তারা মোটেও অবাক নয় । কারন সবাই জানে, এই মেয়ে কয়েক বছর ধরে কত পরিশ্রম করেছে।এই ৪-৫ বছরে দুই একবার বাড়ি গেলেও বাবা তার সাথে কথা না বলাতে পরে সে জিদ করেই যায়নি। আবার এলাকার বিভিন্ন মানুষের কটু কথা। এমনকি অনেকে এও বলেছে , স্বামীকে নিয়ে আসলা না কেন? কয়জন ছেলে মেয়ে হয়েছে? এসব বলতো আর মুখ টিপে হাসতো।আলো কোন কথার প্রতিবাদ করতো না। ভবিষ্যতের অপেক্ষা করছিল।
আজ সেই দিনটি এসেছে। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে চান্স পেয়েছে সে। চারদিক তার সুনাম ছড়িয়ে গেল। মেম্বার সাহেবকে অনেকেই এখন গুরুত্ব দিয়ে কথা বলা শুরু করলো।অনেক জায়গা থেকেই মেয়ের ভালো ভালো বিয়ের সম্বন্ধ আসতে শুরু করল। এলাকার যে লোকেরা আলোর কুৎসা রটনা করেছে। আজ তারাই নিজেদের বোন,ভাতিজি,আত্মীয়স্বজন বলে পরিচয় দিচ্ছে। আজ মেম্বার সাহেব ও মহাখুশি। তাই মেম্বার সাহেব নিজে গিয়ে মেয়েকে হল থেকে নিয়ে আসলেন। অনেকেই বাহবা দিতে চলে আসলেন।এমনকি থানা থেকে ওসি সাহেব নিজে এসে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে গেলেন।
আলো এসব দেখে মনে মনে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে থাকলো আর মনে মনে হাসলো।এটাযে জীবন যুদ্ধে এক যোদ্ধার হাসি, এক বিজয়ের হাসি। এ যে এক বিরাট মানসিক শক্তির বিজয়ের হাসি। আজ সবকিছুকে পিছনে ফেলে মানসিক শক্তির বিজয় হয়েছে। এ হাসি তৃপ্তির হাসি।
ধন্যবাদ সকলকে। সৃষ্টিকর্তা সকলকে ভাল রাখুক, সুস্থ রাখুক। আমার এই লেখাতে কোন ভুল ত্রুটি থাকলে, আশা করি সুন্দর সুন্দর পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করবেন।
কে আমি
আমি মোঃ কাউছার হাসান। একজন বাংলাদেশী এবং নিজেকে বাংলাদেশী হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি ।কারণ আমি আমার দেশকে অনেক বেশি ভালোবাসি। কারণ এটি আমার মাতৃভূমি।আমি শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছি।আমি যখন আমার ছাত্র-ছাত্রীদেরকে নতুন কিছু শিখাতে পারি ।আমার কাছে তখন অন্য রকম অনুভুতি হয়। আমিও প্রতিদিন নতুন কিছু করতে পছন্দ করি, আমি নতুন নতুন লোকের সাথে মিশতে পছন্দ করি এবং নতুন কিছু শিখতে পছন্দ করি। আমি নিজেকে সর্বদা প্রকৃতির ছাত্র হিসাবে ভাবি। কারণ প্রকৃতি থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। আমি কেবল শিখার জন্য ছোট চেষ্টা করি। ভ্রমণ করেতে ভালোবাসি. ভ্রমণের মাধ্যমে প্রকৃতি থেকে অনেক কিছুই শেখা যায়। শিখতে ও লিখতে ভালোবাসি। আমি মানুষকে শ্রদ্ধা করার চেষ্টা করি। আমি মনে করি , কাউকে সম্মান করলে, আমার আত্মমর্যাদা হ্রাস পায় না বরং আরো বৃদ্ধি পায়।