আলো থেকে অন্ধকারে.......

Words
932
Reading
5 min
Listen
Play
6y

কি হয়েছে তোমার? আমার সাথে তুমি কথা বলছো না কেন? প্লিজ একটি বার আমার কথা শোনো, আমার সাথে কথা বল। আমি কি এমন অন্যায় করেছি ?যে আমার ফোন আট বছর পর রিসিভ করেও, আমার সাথে কথা বলছো না। ফোনের ওপাশ থেকে বলছে তন্ময়। তিথি তার মোবাইল ফোনটি কানের মধ্যে রেখে শুধু চোখের পানি ফেলছে। কোন কথার উত্তর দিতে পারছে না। কেননা এই আট বছরে তাঁর জীবনে চারদিকের পরিবেশ এবং কিছু শুভাকাঙ্খী নামের মানুষজন তার জীবনকে কতটুকু অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে শুধুমাত্র সেই জানে। এই আট বছরে তার জীবন সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। আলো থেকে অন্ধকারে হেঁটে চলেছে সে। সেই অন্ধকার থেকে ফিরে আসতে চায় তিথি। কিন্তু কিভাবে ফিরে আসবে উপায় খুঁজে পাচ্ছি না তিথি । তিথি আর তন্ময় একই গ্রামের এবং একই শ্রেণীতে পড়াশোনা করত। প্রথম অবস্থায় ওরা খুব ভালো বন্ধু ছিল।কিন্তু নবম শ্রেণীতে ওঠার পরপরই তন্ময় তিথিকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। তিথি সরাসরি নাকচ করে দেয়।যদিও তাঁর ও তন্ময়কে খুব ভালো লাগতো কিন্তু সে পড়াশোনা করতে চায় এবং ভবিষ্যতে নিজেকে একটি ভালো অবস্থানে নিয়ে যেতে চায়। তাই সে কোন সম্পর্কে জড়াতে চায় না। কিন্তু তন্ময় তিথির পিছনে ছায়ার মত লেগে থাকত। অবশেষে তিথি যখন উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষে পড়ে, তখন তন্ময়ের প্রস্তাবে সাড়া দেয় তিথি।এভাবে দুই বছর চলতে থাকে তাদের প্রেম কাহিনী। তন্ময় সব সময় তিথিকে মনে সাহস যোগাতো, ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার এবং যতটুকু সম্ভব সে টাকা পয়সা দিয়েও তাকে সাহায্য করত। তন্ময় কলেজে পড়া অবস্থায় দুটি টিউশনি করত ,আর সেই টাকা তিথির পিছনেই ব্যয় করত।
একসময় তিথি ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে উঠে যায়। আর এদিকে তন্ময় একটি স্থানীয় কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়। যদিও তন্ময় খুবই মেধাবী ছিল। কিন্তু সংসারের টানাপোড়েন অবস্থা আর ভর্তি কোচিং কিংবা বাসায় তেমন পড়াশোনায় মনোযোগ না দেয়ার কারণে, ভালো কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হবার পর থেকেই কেমন যেন হয়ে গেছে তিথি। সে আগের মত তন্ময়কে সময় দিতে চায়না। দিনে দুই একবার ফোনে কথা বললেও দু'তিন মিনিটের বেশি কথা বলে না। এই দুই তিন মিনিটের মধ্যে অনেক বিরক্তির ছাপ দেখতে পায় তন্ময়।
তিথি এখন স্বনামধন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। তাই সে অজপাড়া গাঁয়ের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের সাথে আর রিলেশন রাখতে চায় না।তার একটি বড় কারণ হল ,তার হলের অনেক বড় আপুরা ,অনেক স্মার্ট বয় নিয়ে মটরবাইকে করে লং জার্নিতে যায়। বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে গিয়ে অনেক ভালো ভালো খাবার খায়। আবার বিভিন্ন শপিং মলে গিয়ে নতুন নতুন উপহার নিয়ে আসে তার বড় আপুরা। তাই তিথির মনে এরকম স্বপ্ন উঁকি দিতে থাকে। তার ও একটি বয়ফ্রেন্ড হবে যে কিনা তাকে নিয়ে লং ড্রাইভে যাবে, অনেক
উপহার দিবে, রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাবে। মাঝেমধ্যে এই ধরনের ইচ্ছা জাগতো তিথির মনে। যাইহোক, এই সময়টি আসতে বেশি দেরি হল না। তিথি দেখতে সম্ভব না হলেও,শ্যামবর্ণের চেহারা এবং শরীরের গঠন খুবই সুন্দর ছিল। এই চেহারা দিয়ে যে কাউকেই সহজে নিজের বশীভূত করা যায়। কয়েকদিন পরই, তার হলের বড় আপু ললিতা এসে বলল, তিথি তোমাকে আমার বয়ফ্রেন্ডের বন্ধু নিলীন খুবই পছন্দ করি। নিলীন বড়লোক বাবার একমাত্র ছেলে। শহরে তাদের পাঁচতলা দুটি বাড়ি আছে ।ওর মোটরবাইক আছে। তিথি মুচকি হাসলো। একসময় তাদের মধ্যে পরিচয় করিয়ে দিলেন ললিতা।তিথি এখন অনেক খুশি। কারণ সে বয়ফ্রেন্ডের মটরবাইকে করে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায় ।বয়ফ্রেন্ড থেকে মোবাইলসহ অনেক কিছুই উপহার পেয়েছে। আবার মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে খেতে যায়। একসময় তন্ময়ের কথা সম্পূর্ণ ভুলেই যায় তিথি।তন্ময়কে অনেক আগেই না করে দিয়েছে সে। তোমার সাথে রিলেশন রাখাটা আমার পক্ষে সম্ভব না, আমাকে ক্ষমা করে দিও। তন্ময় কতক্ষণ নীরবে চোখের পানি ফেলে, সে তিথিকে শুধু এতোটুকুই বলেছে। যদি কোনদিন প্রয়োজন মনে হয় ,তাহলে লজ্জা পেওনা ।জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেলেও তোমাকে সাহায্য করার চেষ্টা করব এবং তোমাকে নিজের কাছে পেতে চাইব। তিথি হেসে বলল ,তোমাকে আমার কখনোই প্রয়োজন হবেনা ।আর আবেগ বাদ দিয়ে বাস্তবতার দিকে চোখ তুলে তাকাও তন্ময় কে বলল তিথি। এটি ছিল তিথি এবং তন্ময়ের আট বছর আগের শেষ ফোনালাপ। তারপর অনেক সিম পরিবর্তন হয়েছে তিথির।

এভাবে নিলিনের সাথে কয়েক মাস সম্পর্কের পর ,বড় আপুদের কথায় বোর হয়ে যায় তিথি। তার হলের বড় আপুরা বললো, একজন এর সাথে আর কত দিন ?এবার অন্য একটা কে ধর! তিথি মনে মনে ভাবল তাইতো। আমাকে তো অনেকেই পছন্দ করে। অনেকের নিজস্ব গাড়ি, বাড়ি সব আছে। এভাবে একের পর এক পরিবর্তন করতে থাকে তিথি।রিলেশন টিকিয়ে রাখতে নাকি শারীরিক সম্পর্কের প্রয়োজন হয় ।এমনটাই ধারণা দিয়েছিল তার বড় আপুরা। সেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে একসময় তিথি তার সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়। আর সেখানেই কোথাও আটকে যায় তিথি, এক ভিডিও ক্লিপে।
ভিডিও ক্লিপ কে পুঁজি করে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বড় ভাই নামের নেতারা তিথিকে সবসময় ব্ল্যাকমেইল করত।পরে একসময় তিথি বুঝতে পারে ।সে আলো থেকে ছিটকে পড়েছে। হেটে যাচ্ছে অন্ধকার কোন অজানা পথে। 20201003_134646.jpg

যে রাস্তায় কোন স্টেশন নেই। মাঝপথে বিশ্রাম নেওয়ার মতো কোন জায়গা নেই। কোন চালক নেই তাকে থামিয়ে দেয়ার মত। এখন তার বড় আপুরা ও তাকে নানান মন্দ ভাষায় গালি দেয়। সম্পূর্ণ দোষ তার উপরে চাপিয়ে দেয়। তাই আজ সে খুবই হতাশ।
চোখ মুখ বেয়ে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে তার। তন্ময়ের ফোনটি কেটে দিয়ে কতক্ষণ হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে সে। তন্ময়ের ফোনটি কেটে দিয়ে তিথি ভাবতে থাকে কতটা ঠকিয়েছি তন্ময় কে। যাদের সাথে এতদিন সময় পার করেছি তাদের চেয়ে শতগুণে তন্ময় অনেক ভাল ছিল। কেউই তন্ময়ের মত যোগ্য ছিল না। টাকা পয়সা দিয়েই একজন পুরুষের যোগ্যতা প্রমাণ করা যায় না। যোগ্যতার জন্য একটি সুন্দর হৃদয়ের ও প্রয়োজন হয়। তন্ময় এখন ও তাকে ফিরে পেতে চায় কিন্তু আর না ।তাকে আর ঠকানো যাবে না। এভাবে ভাবতে থাকে তিথি। মনে পড়ে আট বছর আগের শেষ ফোনকলটির কথাও। যেদিন তিথি বলেছিল তোমাকে আমার কখনো প্রয়োজন হবে না। কিন্তু আজ যে তিথির জীবনে তন্ময় কে ভীষণ প্রয়োজন।
কিন্তু তিথি এখন সমাজে ঘৃণিত। তাকে সমাজ কিংবা সমাজের লোকজন কখনোই মেনে নেবে না ।তাই তন্ময় এর কাছে ফেরা হবেনা। আত্মহত্যা ছাড়া আমার কোন উপায় নেই কিংবা ওই শকুনদের কাছে শিকারি হওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। এভাবে তিথির রুমে অন্ধকার নেমে আসলো। সকলের রুমে সূর্যের আলো পৌঁছালেও ,তিথির মনে আর সূর্যের আলো পৌঁছায় নি......

আলো থেকে অন্ধকারে....... | Ecency