গ্রামের ছেলে সুমন।গ্রাম থেকে কিছু দূরে একটা হাইস্কুল আছে, সেখানেই অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে সুমন। পড়ালেখায় মোটামুটি ভালো সে। তবে দুষ্টুমি তে তার জুড়ি মেলা ভার।
সুমন তার বাবা-মা এর একমাত্র সন্তান। সুমনের বাবা প্রায় দু'বছর আগে রোড এক্সিডেন্ট এ মারা যান। তাই বাবা র অভাব একাই পূর্ণ করার চেষ্টা করেন সুমনের মা। তিনি সবসময়ই সুমনকে সৎ উপদেশ দেন, মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করতে বলেন, মানুষের মতো মানুষ হতে বলেন।
কিন্তু মায়ের কথা শোনার সময় কই সুমনের? সারাদিন পাড়ার দুষ্ট ছেলেদের সাথে মিশে নানান রকমের দুষ্টুমি করে বেড়ায় সে। পাড়ার লোকের আমবাগানের আম চুরি,লিচু চুরি, মুরগির খোয়ার থেকে ডিম চুরি, মৌচাকে ঢিল ছোড়া এসব তার নিত্যদিনের কাজ। এই তো সেদিন সুমন যাচ্ছিল দিনাদের বাড়ির সামনে দিয়ে। পেয়ারা গাছে ঝুলে থাকা ডাসা ডাসা পেয়ারা দেখে সে লোভ সামলাতে পারলো না। সে সোজা উঠে পড়ে পেয়ারা গাছের মগডালে, আর পা দুলিয়ে দুলিয়ে পেয়ারা খেতে খেতে হেরে গলায় গান গাইতে থাকে।
তার গান শুনে তেড়ে বেড়িয়ে আসে দিনার মা। তারপর কি চেঁচামেচি, গালিগালাজ করতে থাকে সুমনকে। এরপর একেবারে সোজা গিয়ে নালিশ করে সুমনের মায়ের কাছে, সুমনের মা কে ও নানা ধরনের কথা শুনিয়া আসে। সুমনের মা মাথা নিচু করে সব শুনে চোখের পানি ফেলতে থাকে। শুধু মুখ বুজে সহ্য করতে করতে কান্না করলেন ।আর একাগ্রচিত্তে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে থাকলেন ছেলের হেদায়াতের জন্য।
মায়ের চোখের কান্না সুমনকে দুষ্টুমি থেকে বিরত রাখতে পারলো না।সে পরের দিন আবার গেল গ্রামের মাতব্বর এর বাগানের ফল চুরি করতে।আর এদিকে গ্রামের মাতব্বর এর নাতি শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে অর্থাৎ তার দাদুর বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। সুমন যেই মুহুর্তে ফল চুরি করছিল মাতব্বর এর বাগানে। সেই মুহূর্তে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয় মাতব্বর এর নাতি।সে দেখল যে সুমন চুরি করতে তার দাদুর বাগানে এসেছে।সে সোজা গিয়ে হাতেনাতে ধরে ফেলে সুমনের হাতটা। তারপর মিষ্টি হেসে সুমনকে বলে, মালিকের অনুমতি না নিয়ে এভাবে বাগান থেকে কোন কিছু চুরি করা মহাপাপ। চুরি করলে অনেক গুনাহ হয়।এসব তুমি জানো না কি???
সুমন ভয়ে ভয়ে বলে, জানি। এবার মাতব্বর এর নাতি সুমন কে অভয় দিয়ে বলে, আল্লাহ তায়ালার বান্দাকে নয়। আল্লাহ কে ভয় করো। তবেই তুমি মহৎ মানুষ হয়ে উঠতে পারবে। মাতব্বর এর নাতির মুখে একথা শুনে সুমন মনে মনে ভাবে, তার মা তো তাকে সবসময় এই চমৎকার উপদেশ গুলোই দেয়।
তোমার নাম কি? মাতব্বর এর নাতির ডাকে সন্বিত ফিরে পায় সুমন।
সুমন বলে : আমার নাম সু ম ন।
তোমার নাম কি?
মাতব্বর এর নাতি উত্তর দেয় , আমার নাম সজীব।
সজীব সুমনকে লক্ষ্য করে বলে, আর কখনো কাউকে কিছু না বলে কোন কিছু চুরি করবে না। সুমন তখন বলে , আমার মা ও তো ঠিক এভাবেই আমাকে নিষেধ করে এসব কাজ করতে।
সজীব বলে, তাহলে তুমি তোমার মা এর কথা শুনো না। বড়দের কথা অমান্য করাও তো গুনাহের কাজ।
সজীব সজীব ! ডাক শুনে সজীব সুমনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ছুটে যায় তার দাদুর কাছে। তারপর সে তার দাদু সহ গ্রাম ঘুরে দেখার জন্য বাগানের বাইরে চলে যায়।
আর এদিকে সুমন একা একা দাঁড়িয়ে সজীব এর বলা কথা গুলো নিয়ে ভাবতে থাকে। সুমন খুব ধীর গতিতে তার নিজের বাড়িতে চলে যায়। পরদিন শান্ত ও বাধ্য ছেলের মতো স্কুল যায়। স্কুলে গিয়ে অন্য দিনের মতো দুষ্টুমি না করে চুপচাপ বসে আছে ক্লাসে। কিছুক্ষণ পর ক্লাস টিচার একটি নতুন ছেলে কে নিয়ে ক্লাসরুমে ঢুকলেন।
ক্লাস টিচার সজীব এর চাচা হোন। তিনি সজীব কে ক্লাসের সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
যাই হোক ক্লাস শেষে টিচার বেরিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর টিফিন পিরিয়ড শুরু হলো। টিফিন পিরিয়ডে সব ছাত্ররা খাওয়া দাওয়া ও খেলাধুলায় মেতে উঠলেও সুমন নিশ্চুপ হয়ে ক্লাসের এককোণে বসে আছে। হঠাৎ কে যেন সুমনের পিঠে আলতো করে পরম মমতায় হাত রেখে ডেকে ওঠে, সুমন তুমি কি খুব একা ?
ঘাড় ঘুরিয়ে সুমন দেখতে পায় সজীব তাকে এভাবে বলছে।
সুমন - সজীব কে বলে , হ্যাঁ আমি অনেক একা। আমার দুষ্টুমির কারণে কেউ আমার বন্ধু হয় না।
সজীব বলে সুমনকে, তুমি আমার বন্ধু হবে ??
সজীবের এ কথায় সুমন খুবই অবাক হয়। কারণ এর আগে কেউ কখনো তাকে এভাবে ভালবেসে কথা বলে নাই।কেউ বন্ধু হতে চায় নাই।
সজীব বলে সুমনকে, আমি তোমার প্রকৃত বন্ধু হবো। দুজন মিলে একসাথে পড়াশুনা ও খেলাধুলা করবো। একসাথে অনেক ভালো কাজ করবো। আমাদের কে অনেক ভালো মানুষ হতে হবে। আর ভালো মানুষ হতে হলে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলতে হবে। সুমন মুগ্ধ হয়ে সজীব এর কথা গুলো গিলতে ছিল।তার মন আবেগে বিগলিত হয়ে চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরে পড়ছিল।
ইতিমধ্যেই ছুটির ঘন্টা বেজে উঠল।সবাই যে যার বাড়িতে চলে গেল। সুমন ও ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে তার নিজের বাড়িতে। পেছনে থেকে সজীবের ডাক শুনে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। সজীব বলে , এসো আমরা দুজন একসাথে মিলে বাড়িতে যাই।আজ থেকে আমরা দুজন দুজনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
সজীবের কথায় সুমন নতুন স্বপ্নের হাতছানি দেখতে পায়। আনন্দে তার চোখ দুটি ঝিলমিল করে ওঠে। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা সুমনের মায়ের দোয়া কবুল করেছেন।
শিক্ষা: মায়ের দোয়ার বরকত। এবং সৎ সঙ্গে সর্গবাস , অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।