প্রতি ঈদেই আমরা বন্ধুরা মিলে কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়। এইবারও তার ব্যাতিক্রম নয়। কিন্তু এইবার ঈদের ছুটিতে আমরা কয়েকজন বন্ধুরা মিলে চিন্তা করলাম দূরে কোথাও ঘুরতে যাবো। হঠাৎ মনে হলো বাইক নিয়ে কিশোরগঞ্জের মিঠামাইন, অষ্টগ্রাম ঘুরতে যাওয়া যায়। আমার অনেক দিনের ইচ্ছে ছিলো বাইক নিয়ে কিশোরগঞ্জ যাওয়ার। সবাই যাওয়ার জন্য রাজি হলো এবং আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম ঈদের পরের দিন রওনা হয়ে যাবো। হঠাৎ যাওয়ার আগের দিন কিছু কারনে কয়েকজন না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। তাই মনটা খারাপ হয়ে গেলো। কোথাও যাওয়ার প্ল্যান করে সেটা কোন ভাবে যদি সিদ্ধান্ত পাল্টানো হয় যে কারো অনেক কষ্ট লাগাটাই স্বাভাবিক। আমারো খুব খারাপ লাগছিলো।
আমরা পরের দিন চারজন বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম কেউ যেহেতু যাচ্ছে না আমরা চারজন মিলেই কোথাও ঘুরতে যাবো। যেদিকে মন চাই ঘুরবো আজকে। একজন বন্ধু বললো চল ময়মনসিংহ হয়ে বিরিসিরি যাই। ময়মনসিংহ বিরিসিরি মোটামুটি ভালোই দুরত্ব। তারপর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম চার জনেই আমরা রওনা হবো বিরিসিরির উদ্দেশ্যে। যে পর্যন্ত যেতে পাড়ি, এই সিদ্ধান্ত নিয়েই আমরা সকাল ১০ টার আগেই বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের উদ্দেশ্য হলো আমরা আজকে সারা দিন ঘুরবো যেদিকে মন চায় সেদিকেই চলে যাবো। যাওয়ার পথে মধুপুর থেকে বাইকে তেল তুলে নিলাম যথেষ্ট পরিমানে। শুরুতেই আমাদের সামনে পরলো মধুপুর গড়। মধুপুর গড় সম্পর্কে আমরা কম বেশি সবাই জানি। মধুপুর গড় বাংলাদেশের সব থেকে বৃহৎ গড় এর মধ্যে একটি। মধুপুর গড় সত্যি দেখতে অনেক ভয়ংকর কারন একদম গহিন জঙ্গল। সেই গড়ের মাঝখান দিয়ে টাংগাইল ময়মনসিংহ হাইওয়ে রোড।
ময়মনসিংহ শহরে ডুকার পর আমাদের দুইজনের একটা ভিন্ন চিন্তা আসলো। আমরা যেহেতু বিরিসিরি দিকেই যেতে চাচ্ছি এই জাইয়গার দূরত্ব ৭০কিঃমিঃ আর কিশোরগঞ্জ অষ্টগ্রামের দূরত্ব প্রায় ১১২ কিঃমিঃ। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে কিশোরগঞ্জে যাবো। কিশোরগঞ্জে থাকে আমার বন্ধু অপূর্ব, অকে ফোন দিয়ে কিছু তথ্য জেনে নিলাম। কিভাবে কোথায় দিয়ে যাবো। পরে আমরা বিরিসিরির সিদ্ধান্ত বাতিল করে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিলাম।
ময়মনসিংহ থেকে ত্রিশাল হয়ে কিশোরগঞ্জ যাবো। তো আমরা ত্রিশাল বাসস্টপ এর উপর দিয়ে আমরা কিছু দূর যাওয়ার পর একটা সুন্দর সেতু দেখতে পাই। জায়গাটার নাম ত্রিশাল বালিপাড়া সেতু। সেখানে আমরা যাত্রা বিরতি দেই। হালকা নাস্তা করে আমরা আবার রওনা হয়ে পরি। সবাই বলতো যে বাইক চালিয়ে দূরের যাত্রায় যাওয়া নাকি কষ্ট অনেক। তখন বুঝতাম না ভাবতাম কিসের কষ্ট বাইক চালিয়ে যাবো। এতো দূরে গিয়ে বুঝতে পারছি বাইক চালিয়ে দূরের যাত্রা সত্যি অনেক কষ্টের। তার মধ্যে যদি একা একজনের বাইক চালাতে হয়। শরীর হাত পা ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে। কি আর করবো আমরা তো উদ্দেশ্য নিয়ে বের হয়েছি সেই উদ্দেশ্য তো পূরন করতেই হবে। তাই কোন কষ্ট কে তোয়াক্কা না করে আমাদের মতো চলতেই থাকি। আমার যেই বন্ধুর বাসা কিশোরগঞ্জ বন্ধুর গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ শহরের আগেই তাই অপূর্ব কে ফোন দিয়ে জানাই। অপূর্ব আমাদের সাথে যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু বন্ধু আগেই অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমাদের সাথে যেতে পারে নি।
আমরা কিশোরগঞ্জ শহর পারি দিতেই ঘন্টা খানেক লেগে গেলো কারন কিশোরগঞ্জ শহরে অনেক অটো রিক্সার জ্যাম ছিলো। যাইহোক এভাবেই আমরা এগিয়ে চললাম। অষ্টগ্রাম যাওয়ার প্রায় ৫০কিঃমিঃ আগে আমরা এক জায়গায় যাত্রা বিরতি দেই। সেখানে চা বিস্কিট খেলাম। আর সেখানকার একজন লোককে জিজ্ঞাসা করলাম অষ্টগ্রাম যেতে আর কত সময় লাগবে সে বললো বেশি সময় লাগবে না। অপূর্ব কে ফোন দিয়ে ভালোভাবে জেনে নিলাম কোন দিক দিয়ে গেলে ভালো হবে। অপূর্ব বললো ২ টা ফেরি পারি দিতে হবে। আমরা তার পর রওনা হয়ে গেলাম। কিছুখন পরে আমাদের সামনে পরলো অনেক জেম রাস্তায় সামনে দেখি ফেরিঘাট। আমরা লক্ষ করলাম যদি ফেরি দিয়ে এই নদীটা পারি দিতে যাই আমাদের অনেক সময় লেগে যাবে। কিন্তু আমাদের হাতে তেমন সময় নেই কারন আমাদের তো আবার বাড়ির পথে ফিরতে হবে। আমরা সেখানে এক নৌকা করে নদীটা পারি দিলাম। এতো সুন্দর একটা জাইয়গা প্রতিদিন এতো মানুষ সেখানে ভ্রমন করে। এই জায়গাই এই নদীটাতে ফেরি দিয়ে পার হওয়া সত্যি অনেক কষ্টের। এত মানুষ প্রতিদিন সেখানে ভ্রমন করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পরে যায়। সেখানকার চেয়ারম্যান মেম্বার যারা তাদের এই বিষয় টা খেয়াল করা দরকার। যদি একটা ব্রিজ করতে দিতে পারে তাহলে মানুষের এই ভোগান্তি টা আর থাকবে না।
এইভাবেই আমরা পরের ফেরিও পারি দিয়ে অষ্টগ্রাম হাওর এলাকায় ডুকে আমাদের মন প্রশান্তি ফিরে এলো। হাওর এর মাঝে মাঝে কয়েক টা গ্রাম সামনে পরলো গ্রাম গুলো এতো সুন্দর ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আমাদের এতো দুরের রাস্তা পারি দিয়ে এসে যেই ক্লান্তি টা ছিলো সব টুকুই নিমিশে চলে গেলো হাওর এলাকার সৌন্দর্য দেখে। আমরা একটা ব্রিজে গিয়ে দাড়ালাম সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে ব্রিজের নিচে ছোট একটা গ্রাম। ছোট ছোট ঘর এবং বড় বড় খড়ের স্তুপ দেয়া গ্রাম গুলো দেখলে চোখ জুড়িয়ে আসে। আমার মনে একটা প্রশ্ন আসলো যখন পানি আসে হাওরে তখন এই গ্রাম গুলিও পানিতে ডুবে যায়। তখন এই মানুষ গুলো কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেয়? যাই হোক পরে ভাবলাম হইতো বা এদের থাকার ব্যবস্থা আছে সেখানেই যাবে। এটা ভেবেই আমরা সামনে এগিয়ে চলি। হাওরের রাস্তা গুলো আর রাস্তার পাশে থাকা গ্রাম, হাওরের মাঝে কতো সত গুরু ছাগল দিয়ে রাখছেন। এগুলো দেখে এক কথায় আমরা মুগ্ধ হয়ে যাই।
আমরা মিঠামাইন ডুকতেই শুরুতে সামনে পরে আমাদের দেশের একজন সম্মানিত ব্যাক্তির বাড়ি, যার অবদানেই আজ হাওর অঞ্চল এতোটা উন্নতি হয়েছে। সে যদি এই হাওর অঞ্চলে এইভাবে রাস্তাঘাট না করে দিতো তাহলে হইতো অই অঞ্চলে কেউ তাকিয়েও দেখতো না। সেই সম্মানিত মানুষ টি হলো আমাদের দেশের রাষ্ট্রপ্রতি আব্দুল হামিদ। তিনি হাওর অঞ্চল টা এমন ভাবে সাজিয়ে তুলছেন। যেখানে সবাই ঘুরতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। হইতো উনি যদি এই উন্নতি না করতেন তাহলে আমাদের দেশের অধিকাংশ লোক জানতেন না যে কিশোরগঞ্জে এমন সুন্দর একটা হাওর আছে। আর বড় কথা হলো কিশোরগঞ্জ হাওর থেকেই আমাদের দেশের অধিকাংশ ধান চাল এর জোগান দিয়ে থাকে। আমরা রাষ্ট্রপতির এলাকা টা ঘুরে দেখলাম। মিঠামাইন অষ্টগ্রাম এর যেই রাস্তা গুলো হাওর এর মাঝখান দিয়ে করেছে। সেই রাস্তা দেখে এমন কেউ নাই যে মুগ্ধ না হবে। এতো সুন্দর রাস্তা আর এতো সুন্দর হাওর এর মাঝে গ্রাম গুলি অই এলাকাটা কে আরো ফুটিয়ে তুলেছে।
আমরা ঘুরেফিরে সব জায়গা দেখে আবার রওনা হয়ে পরি বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে। কারন আমাদের আবার বাড়ি ফিরতে অনেক রাস্তা যেতে হবে এই ভেবে আমরা আগেই রওনা হয়ে যাই। আমাদের সেদিন বাড়ি ফিরতে প্রায় রাত ২ টা বেজে গেছিলো। আলহামদুলিল্লাহ আমরা সুস্থভাবেই সবাই বাড়ি পৌঁছে যাই। এইভাবেই আমরা একটা সফল বাইক ভ্রমন করে ফেলি।