বাবা নামটি প্রতিনিয়ত ডেকে আসছি বা কেউ কেউ শুনে আসছি। কিন্তু যার বাবা দুনিয়া থেকে চিরতরে চলে গিয়েছে, সে তো কখনই আর পারবে না বাবা বলে ডাকতে। কখন আর পারবে না বাবা ডাকটি দিয়ে কিছু আবদার করতে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। দুনিয়া থেকে সবারই চলে যেতে হবে কেউ আগে যাবে কেউ বা পরে। কিন্তু কিছু কিছু সময় এই চলে যাওয়াটা মেনে নেয়ার মতো অবস্থায় থাকে না। সবারই বাবা এক সময় চলে যাবেন কিন্তু কেউ চলে যায় বৃদ্ধ অবস্থায় কেউবা অকালেই। যদি বৃদ্ধ অবস্থায় চলে যায় তার কোন চিন্তা থাকে না তার সন্তান বড় হয়ে গিয়েছে এবং পরিবারের সবাই সেটা কিছুটা মেনে নিতে পারে। কিন্তু যদি একজন বাবা ১০,১২ বছর বয়সের সন্তান রেখে চিরতরে চলে যায়। সেই সন্তানের মতো কষ্ট পৃথিবীতে মনে হয় আর কারো নেই।
এমনি এক ঘটনা ঘটেছেন আমার পরিবারের সাথে। আমার বড় বোনের স্বামীর অসুস্থতার কারনে অকাল মৃত্যু আমরা কখনই মেনে নিতে পারি না। আমার বোনের এক ছেলে এক মেয়ে। যখন ভাইয়া ইন্তেকাল করেন তখন আমার ভাগিনার বয়স ছিলো ১১ বছর আর ভাগ্নির বয়স ছিলো ১৪ বছর। এতো ছোটকালে ওরা বাবা কে হারাবে কখনও কল্পনাও করি নি আমরা। কিন্তু কি করা, কথায় আছে কপালে যা লিখা আছে তাই তো হবে চাইলেও আমরা তার পরির্বতন করতে পারবো না। আসলে বাবা হারানোর পর ছেলে মেয়ে কেমন পরিবর্তন হয় তা আমার এই দুই ভাগিনা ভাগ্নি কে না দেখলে হইতো বুঝতাম না। দুইজনেই ছোট থেকে বড় হয়েছে কখনও কোন কিছুর অভাব হয় নি ওদের। কখন কোন কিছুর জন্যে আবদার করতে হতো না বাবা মার কাছে। ওদের বাবা এতো আদর করেছেন কোন কিছু আবদার করার আগেই পেয়ে গিয়েছে। কোন দিন কোন খাওয়ার কিছু চেয়ে খেতো না দুই ভাইবোন কেউ। দোকানে গিয়েও অন্যান্য ছেলে মেয়েরা যেমন দোকানে আসলে কান্নাকাটি করে এটা সেটা খাওয়ার আবদার করে। কিন্তু ওদের কে জোড় করেও কিছু খাওয়ানো যেতো না দোকানে নিয়ে গিয়ে।
এইভাবেই বড় হচ্ছিলো দুই ভাইবোন অনেক আদরের ছিলো ওরা, ওদের বাবার কাছে। কিন্তু কপালের লিখন তো আর পাল্টানো যায় না। এতো ছোটবেলায় তারা তাদের মাথার উপরের বট গাছ যাকে বাবা বলা হয় সেই বট গাছই হারিয়ে ফেললো। যখন বাবা কে হারালো তখন হইতো ওরা বুঝে উঠতে পারেনি কি হারিয়ে ফেললো চিরতরে। মনে মনে হইতো ভাবছে হইতো বাবা ফিরে আসবে। তখন না বুঝলেও আস্তে আস্তে এখন ঠিকি বুঝতেছে যে ওরা কি হারিয়েছে। আল্লাহ ওদের মাঝে এতোটাই ধৈর্য এনে দিয়েছে নিজের বাবার অভাবটা বুকে নিয়েই ওরা দিন কাটাচ্ছে। এখন ওরা চাইলেই পারে না আর ১০টা ছেলে মেয়ের মতো বাবা কে ডাকতে। এই ছোট বয়সে সবার কত কি চাওয়ার থাকে, কতো কি খেতে চাওয়ার আবদার করে বাবার কাছে। কিন্তু ওরাতো কিছুই পারছে না। এতো টা ধৈর্য আল্লাহ দিয়েছে ওদের ভিতরের ইচ্ছে গুলোও কখনও প্রকাশ করে না।
যখন ওদের দেখতে যাই আমি কতো জিজ্ঞাসা করি যে তোমার কিছু লাগবে কি? কিছু খেতে মন চায়? হাজার বার জিজ্ঞাসা করলেও বলে না আমার এটা লাগবে বা খেতে ইচ্ছে করছে কিছু। আমার ভাগিনাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিয়েছি। আমরা অনেক বলেছি স্কুলেই পড়ো কিন্তু এতো ছোট একটা ছেলে নিজে থেকেই ঠিক করেছে আমি মাদ্রাসায় পড়বো স্কুলে পড়বো না। মাদ্রাসায় অকে দেখতে গেলেই ওর একটি আবদার আমাকে নিয়ে একটু বাহিরে ঘুরতে নিয়ে যাও। এছাড়া আর কখনও কোন আবদার করে না। একদিন ঘুরতে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছি আব্বু তোমার আব্বুর কথা কি মনে পরে তোমার? প্রথম বার না না করলো পরে আবারও জিজ্ঞাসা করেছি। কিছুখন চুপ করে থেকে পরে বলে হ্যাঁ মনে পরে রাতে যখন ঘুমাতে যাই তখন অনেক কান্নাও আসে। ওর কথা শুনে আমি আমার চোখের পানি চেপে রাখতে পারলাম না তখন। মনে মনে আল্লাহ কাছে দোয়া করলাম আল্লাহ যেনো এই ছোট বয়সে কাউকে এতিম না করে।
বাবা হারানোর কি কষ্ট যারা হারিয়েছে একমাত্র তারাই জানে। তাদের বাবা ছাড়া দুনিয়াতে সকল শখ ইচ্ছে ফুরিয়ে যায়। হইতো আশে পাশে অনেকেই পাশে থাকে কিন্তু বাবার যে অভাব টা সেই স্থানটি কোন দিনও কেউ পূরন করতে পারে না। সব সময় দোয়া করি অল্পবয়সে কেউ যেনো তাদের জীবনের উপর থেকে এতো বড় একটি ছায়া না হারায়। আমাদের বাবা তো আছেই তাই আমরা হইতো বুঝিনা বাবা কি জিনিস। আমাদের জীবনের জন্যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যারা হারিয়েছে বাবা কে তারাই বুঝে তাদের জীবনে বাবার কতটা প্রয়োজন। প্রতিটি মুহুর্তে তারা হইতো ভাবে সবার বাবার মতো আমাদের বাবাও যদি আমাদের কাছে থাকতো? যদি আমাদের বাবা ফিরে আসতো।