এইতো মাস দুয়েক আগের কথা বলছি। ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ, আমাদের মিড টার্ম পরীক্ষা চলে। শেষের পরীক্ষাটা কোনো একটা কারণবশত ১ সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া হয়। পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়াতে সবাই চিন্তা করতেছি এতদিন কি করা যায়? তখন আমার বন্ধু সৌরভের মাথায় ভূত চাপলো আমরা বন্ধুরা সবাই মিলে সেন্টমার্টিন যাবো। সবাই মিলে একসাথে অনেক দিন ঘুরতে যাওয়া হয় না। তাই ভাবলাম পরীক্ষার ফাঁকে রিফ্রেশমেন্ট এর জন্য ঘুরে আসাই যায়।
যেই ভাবনা সেই কাজ। আগের দিন রাতে টিকেট বুক দেওয়া হয় সেন্টমার্টিন পরিবহনে। আর পরের দিন আমাদের একটা এক্সাম ছিলো। আমাদের প্ল্যান ছিলো এক্সাম শেষ করে আমরা বের হবো টুরের উদ্দেশ্যে। আমাদের বাস রাত ৭টায় গাবতলী বাস স্ট্যান্ড ছেড়ে টেকনাফের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে। আমরা সন্ধ্যা ৬ টায় বাস স্ট্যান্ডে এসে বাস এর জন্য অপেক্ষা করি।
ঢাকা থেকে টেকনাফ যাওয়ার জন্য বাসের অনেক পরিবহন আছে। বাস ভেদে ঢাকা থেকে টেকনাফ এর ভাড়া ১০০০ থেকে ২৫০০ এর মধ্যে। সময় লাগে প্রায় ১০-১২ ঘণ্টা। রাস্তায় যানজট থাকার কারণে আমাদের সময় লেগেছিল প্রায় ১৪ ঘণ্টা।
প্রতিদিন সকাল ৯ টা থেকে সাড়ে ৯ টায় টেকনাফ জেটি ঘাট থেকে জাহাজ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।আবার ফেরার পথে সেন্টমার্টিন থেকে যাত্রা শুরু করে ৩ টা থেকে সাড়ে ৩ টায়। রাস্তায় যানজটের কারণে আমরা শুরুতে ভাবছিলাম আমরা হয়তো সেন্টমার্টিনের জাহাজ মিস করবো। ভাগ্যক্রমে আমরা ৯ টার মধ্যে টেকনাফ ঘাটে এসে সাড়ে ৯ টার জাহাজ ধরতে পারি। তবে যারা এই জাহাজ মিস করে তারা অনেকে ট্রলারে করে সেন্টমার্টিন যান। যেটা অনেক বিপদ জনক। আর জাহাজের শ্রেণিভেদে যাওয়া আসার ভাড়া ৬০০-৮০০ টাকা এর মধ্যে। সুমুদ্র পথে সেটাই ছিলো আমার প্রথম যাত্রা।
সময় সল্পতার কারণে আমরা সকালের নাস্তা কিনে ব্যাগে রেখে দেই,জাহাজে উঠে খাবো বলে। আর আমরা সাথে কিছু চিপসের প্যাকেট কিনে রাখি পাখিদের খাওয়ানোর জন্য। সেন্টমার্টিন ভ্রমণের আসল মজাটাই হচ্ছে সমুদ্রে জাহাজ ভ্রমণ। জাহাজ ছাড়ার সাথে সাথে হাজার হাজার গাংচিলের দল উড়ে বেড়াবে আপনার পিছু পিছু। কিছুক্ষণের জন্য আপনি হারিয়ে যাবেন গাংচিল রাজ্যে। চিপস বাতাসে ছুড়ে দিলে পানিতে পড়ার আগেই ছো দিয়ে তুলে নিবে গাংচিল গুলো। এই অনুভূতি গুলো আপনি টাকা দিয়ে কিনতে পারবেন না।
নাফ নদীর ভিতর দিয়ে ,বার্মিজ সীমান্ত ঘেঁষে ধীরে ধীরে আমাদের জাহাজ হারিয়ে যায় অশান্ত নীলচে সবুজ পানির রাজ্য বঙ্গোপসগরের বুকে। যেদিকে দু চোখ যায় শুধু পানি আর পানি কিছুক্ষণের জন্য মনে হচ্ছিলো আমি হারিয়ে গিয়েছি এই সমুদ্রের বুকে। সেই মুহূর্তে খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারি যে, আল্লাহর সৃষ্টির কাছে আমরা কতটা ক্ষুদ্র,কতটা তুচ্ছ। প্রায় ৩ ঘণ্টা সমুদ্র পথের যাত্রা শেষ করে আমরা পৌঁছাই বাংলাদেশের এক মাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন।
জাহাজ থেকে নামার পর আমাদের প্রথম কাজ ছিলো হোটেল ঠিক করা,থাকার একটা ব্যাবস্থা করতে হবে। তারপর আমরা সবাই মিলে থাকার জন্য রুম খুঁজতে থাকি। প্রায় দেড় থেকে ২ ঘণ্টা অনেক খোঁজা খুঁজির পর আমরা আমাদের পছন্দ মত রুম খুঁজে পাই। আমাদের হোটেলটি ছিলো একদম সমুদ্র সৈকত এর সাথেই। তাই ভাড়াটাও একটু বেশি পরে। তবে সমুদ্র সৈকত থেকে একটু বাইরে রুম ভাড়া একটু কম। হোটেল বা রিসোর্ট ভেদে ভাড়া পড়বে ১৫০০-৫০০০ টাকা।
রুমে ফ্রেশ হয়ে আমরা বের হই দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য। জার্নি করে , হাঁটা হাঁটি করে আমরা সবাই অনেক ক্ষুধার্থ। আমাদের থাকার জায়গার আশেপাশেই ছিলো অনেক গুলো খাবার হোটেল। সেখানে যে আমরা দুপুরের খাবার খাই। খাবার হোটেল গুলোতে অনেক ধরনের সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়। আপনি চাইলে ফ্রাই খেতে পারেন, কারি খেতে পারেন। আবার চাইলে বার্বিকিউ ও করতে পারবেন। তবে খাবার হোটেল গুলোতে মাছ গুলোর দর দাম করে নেওয়া ভালো। খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমরা সবাই সমুদ্র বিলাসে চলে যাই,সমুদ্র উপভোগ করতে।
সেন্টমার্টিনে কাটানো মুহুর্ত গুলো কেমন ছিলো সে সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা হবে দ্বিতীয় খন্ডে ইনশাআল্লাহ্।