আহাদ গ্রামের শিখন স্কুলের একজন ছাত্র। আহাদ বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। তার বয়স মাত্র ৭ বছর। একমাত্র সন্তান হওয়া সত্বেও সে তার নানির কাছে বেড়ে ওঠা। আর এর সাথে মজার বিষয় হলো আহাদ তার নানিকে দাদি বলে ডাকে। কারণ আহাদের মামাতো ভাইবোনেরা তার নানিকে দাদি বলে ডাকে এজন্য আহাদ ও দাদি বলে।
মানুষের জীবন মানেই চড়াই উৎরাই। আবার ভালোবাসা, হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, মায়া, দায়িত্ব এগুলোও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোনো মানুষ কখনো সুখ-শান্তির মধ্য দিয়ে আগে যায়।আবার কেউবা জন্মের পর থেকেই কষ্টের মধ্যে দিয়ে যায়। ঠিক সেরকমই আহাদের জীবনের শুরু।
আমার বাড়ি থেকে কয়েক বাড়ি পরেই আহাদের নানুবাড়ি। সেই সূত্রেই আহাদের সব কিছুই আমাদের নিজে চোখে দেখা। একমাত্র সন্তান হওয়া সত্যেও আহাদ বরাবরই বাবা মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত। কারণ আহাদের বয়স ১বছর হওয়ার পর পরই আহাদের বাবা মায়ের সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে।এরপর আহাদের বাবার মতো আহাদের বাবা আলাদা হয়ে যায়। তার কখনো খোজ নেই।আর আহাদের মা আহাদের যখন ১বছর ২মাস তখন ঢাকায় পাড়ি জমায় স্বাবলম্বী হওয়ার উদ্দেশ্যে। কিছুদিনের মধ্যে সে গার্মেন্টসে চাকরি নেয়।প্রথম প্রথম সে অনেক টাকা পয়সা পাঠাতো ছেলের জন্য।সময় পেলেই ছেলেকে দেখেতে আসত।কিছুদিন পর আহাদের মা অন্যত্র বিয়ে করে ঢাকায় একবারে থাকা শুরু করে। নতুন সংসারের চাপে একটু হলেও আহাদের প্রতি তার দায়িত্বের টান ঢিলা হতে থাকে।কারণ আহাদের মায়ের দ্বিতীয় স্বামী আহাদেকে সেভাবে গ্রহণ ও মেনে নিতে পারে নি।
তারপর এভাবেই চলতে থাকে আহাদের নানির সাথে আহাদের জীবনযাত্রা। তবে আহাদ এগুলো কখনো বুঝেও না।সে চলে তার নিজের মত করে। আহাদ খুবই চঞ্চল প্রকৃতির। আহাদ পাড়ার অনেকেরই বেশ উপকার করে বেড়ায়। কার গাছে আম পারতে হবে , কার গাছের পেয়ারা, জাম পারতে হবে,কার পুকুরে মাছ ধরে দিতে হবে তার মাথা ব্যাথার শেষ নাই। অনেকেই আহাদকে এই উপকারের জন্য অল্প কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করে থাকে। ওর নানা একজন দিনমজুর।কখনো কাজ পায় কখনো পায় না।সংসারের খাবারের যোগান দিতেই সে হিমশিম খেয়ে যায়।এজন্য আহাদের অন্যান্য দায়িত্ব সে নিতে পারে না। মাঝে মাঝে ওকে দেখে আমি ভাবি ওর শৈশব কতো কষ্টের কতো অনিশ্চ়তায় ভরা।কিন্তু ও এসব বোঝেই না।ও জানে সবার শৈশব বুঝি এমনই হয়।
এবারের ছুটিতে বাড়ি গিয়ে দেখি আহাদ একটি ব্যাগ নিয়ে কোথাও যাচ্ছে ।আমি ডাকলাম কই যাস?বললো মামা আমি শিখন স্কুলে ভর্তি হইসি। আমি এখন স্কুলে যাই।কথা টা শুনে খুব খুশি হইলাম ।আর বললাম স্কুল শেষ হইলে যাওয়ার পথে দেখা করিস। মনে মনে ভাবলাম অবশেষে আহাদ স্কুলে ভর্তি হয়েছে।স্কুল শেষে ও আমার সাথে দেখা করে। বাচ্চাদের সাথে কিছুক্ষন সময় কাটালাম।
আমি মনে করি একজন শিশুর বাবা মায়ের ভালোবাসা ছাড়া বেড়ে ওঠা অনেক কঠিন।একজন শিশু যখন দেখে অন্য কোনো বাবা মা তারই বয়সের আর একটা শিশুকে কতো ভালোবাসে। সেইটা দেখে আহাদের মত শিশুদের মনের মধ্যে কতো কষ্ট হতে থাকে। তাদের অভিভাবকদের জন্য তারা এবং তাদের ভবিষৎ কতো অনিশ্চয়তায় থাকে।
একটা ছেলে বা মেয়ের ভালোভাবে বেড়ে ওঠার জন্য বাবা মায়ের ভূমিকা অনেক। সব অভিভাবকদের অনুরোধ করি সন্তানের কথা চিন্তা করে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিন। কারণ এই সন্তান আপনাদের।আপনাদের বিচ্ছেদ সম্পূর্ণটা আপনার বাচ্চার ওপর গিয়ে প্রভাব পরে।অথচ তাদের ভবিষৎ সুন্দর করার কারিগর আপনারাই।