ছোট বেলা থেকে গ্রামে বেড়ে উঠা বলে সারাদিন এদিক ওদিক টই টই ঘুরে বেড়াতাম। গ্রামে বন জঙ্গলের অভাব নেই বললেই চলে সে সুবাদে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে দশ্যি পনার শুরু। গ্রামে তৃতীয় থেকে ৫ম শ্রেণীর ক্লাস শুরু হতো ১২ থেকে চলতো ৪টা পর্যন্ত। মাঝখানে ৩০ মিনিটের বিরতি। ফলে ক্লাস শুরু হওয়ার আগে একবার চলতো বন জঙ্গলে অভিযান। স্কুল শেষে আরো একবার, তখন থেকেই আমার নেশা পায় অজানাকে জানার অদেখাকে দেখার অর্থাৎ ভ্রমণের নেশা।
প্রাথমিকে তো "শিক্ষা সফর" হতোনা এর জন্য কোথাও নিয়ে যেতনা। বড় ভাইরা যখন যেতো তখন মন খারাপের গল্পেরা অভিমানে ভিজে যেতো চোখের জলে আর মবন মনে ভাবতাম কবে মাধ্যমিক স্কুলে পড়বো কবে শিক্ষা সফরে যাবো। এর মধ্যে বাড়ির আসেপাশে জেলা শহর সব ঘুরে দেখে শেষ করলাম প্রাথমিকে পড়া শেষ করার আগে।
মাধ্যমিকে উঠার পর মনে কী আনন্দ আহা এবার বড় হয়ে গেছি এবার শিক্ষা সফরে যেতে কোন মানা নেই, "কোথাও আমার হারিয়ে যেতে নেই মানার" মতো অবস্থা!
এখনতো অবশ্যই কিন্ডারগার্ডেনের ফোলাপাইনও শিক্ষা সফরে যায় কিন্তু আমাদের সময় ৭ম-৮ম শ্রেণির জন্য ও প্রয়োয্য ছিলোনা শিক্ষা সফর! নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা যখন শিক্ষা সফরে যতো তখন মনকে বুঝাতাে আশ্রয় নিতাম রবীন্দ্রনাথে
"বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু । দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু"
আর নিজেকে সান্ত্বনা দিতে ছুটে যেতাম বন্ধুদের নিয়ে বাড়ির পাশে ফেণি নদীতে, মুড়ি প্রজেক্টে, সুইস গেটে।
ময়নামতি সফর দিয়ে আমার প্রথম শিক্ষা সফর শুরু হয় নবম শ্রেণি থেকে। আর তখন থেকে চমি পাহাড়ের প্রমে পড়ে যায়। এবং তখনই বুঝি পাহাড় মানুষের মনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে।
এসএসসি পরীক্ষার পর ঘুরতে গেলাম কক্সবাজার, জীবনে প্রথম সমুদ্র দেখা, সমুদ্রের জল দেখে, ব্যাপ্তী দেখে নিজেক খুব ছোট মনে হইছে এবং এক প্রকার লজ্জাই পেলাম। তখন থেকেই পাহাড় আর সমুদ্র আমার সবচেয়ে প্রিয়।
কলেজে ভর্তি হলাম ঢাকার নাম করা কলেজে, ঢাকায় এসে ঢাকার প্রায় সব কয়টি প্রসিদ্ধ জায়গা দেখা হয়ে গেলো। কিন্তু মন ভরে না চারদিকে এতো এতো স্থাপত্য দেখেও ঐ যে গ্রামের ছেলে বলে কথা! বন জঙ্গল, নদী, পাহাড় দেখে যার বড় হওয়া। মন বেশি খারাপ হলে চলে যেতাম মাওয়া ঘাটে কখনো বা মানিকগঞ্জের ফেরি ঘাটে যাতে দুধের সাথে ঘোলে মিটানো যায়!
কলেজে ও আমাদেরকে একবার শিক্ষা সফরে নিয়ে গিছে সে মোল্লাদের দৌড় সীমিত পর্যন্ত এর মতোই আবার সে ময়নামতি!
বড় ভাইদের কাছে শুনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে অনেক ট্যুর পািয়া যায়। সে থেকে ভাবি কবেযে ভর্তি হবো বিশ্ববিদ্যালয়ে!
যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর দেখি প্রতি বছরই ট্যুর! আহা কি মজা!! মনে আনন্দ থাকলেও পকেটের অবস্থা ত্রাহি মধুসূদন। যাক বারতি টিউশনি করে টাকার ব্যবস্থা করে ফেলতাম কখনো বা খরচ বাচিয়ে। আহা কী আনন্দ!! বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আমরা ঘুরার স্বাধীনতা পেতাম, আমাদেরকে ৪-৫ দিনের শিক্ষা সফরে নিয়ে যাওয়া হতো। তখন নিজেকে এ্যাডাল্ট ভাবতে শুরু করলাম। তখন আমাদেরকে সেন্ট মার্টিন, কুয়াকাটা, বান্দরবান এগুলাতে নিয়ে যতো, আবার বাড়তি পাওনা সার্ক ট্যুর! যদিও আমি যেতে পারি নাই।
মাঝে একবার চিন্তা করে রাখছি ভ্রমণের নেশাকে কীভাবে পেশা বানিয়ে নেয়া যায়!! পরে পেশার চিন্তাটাও বাদ দিলাম কারণ বিয়ের বাজারে গাইডের চাকরি অতো যুতসই নয়! বিয়ের জন্য বানানো সিভি থেকেও বাদ দিলাম আগ্রহের জায়গা ভ্রমণ কারণ এক মেয়ে বন্ধু থেকে জানলাম যারা ইন্টারেস্ট এর জায়গা যারা ভ্রমণের কথা লেখে তারা টাউট শ্রেণীর হয়😏😏
করোনার পকোপে হয়তো এখন আর আগের মতো ঘিরতে পারবোনা কিন্তু ভ্রমণ বিষয়ক বই পড়ে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াবো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা, এক দেশ থেকে আর এক দেশ!
"বিশাল বিশ্বের আয়োজন মন মোর জুড়ে থাকে
অতি ক্ষুদ্র তারে এক কোনে, সে কোনে পাড়ি গ্রন্থ ভ্রমণ বৃত্তান্ত আছে যাহা অক্ষয় উচ্ছ্বাসে "
বি.দ্র. আমি ভ্রমণে গিয়া ছবি তুলতে একদম পছন্দ করিনা, যা কিছু ধারণ করা যায় চোখ এবং মন দিয়ে তাই রেখে দি জীবন্ত।