শহরের বড়ো বড়ো দালান, দালানে জড়িয়ে থাকা বাহারি ইট, টবে সাজানো বুনো গাছ, গেটের সামনে দারোয়ান দাঁড়ানো এই সব দেখে ফিলে চমকিয়ে যায় তপনের। গ্রাম থেকে আাসা কোন বালকের কাছে মতিঝিলে বাংলাদেশ বাংক ভবন দেখে তো ফিট হয়ে যাওয়ারই কথা, মানে মোবাইল ফোন, আর ইন্টারনেট যখন সোনার হরিণ ছিলো তখন।
সদ্য এইচএসসি পাশ করা মফস্বল শহরে বেড়ে উঠা বালকের কাছে মেগা সিটি ঢাকাতো তার কল্পনার থেকে ও বড় মনে হয়। গাড়ি থেকে মতিঝিল এসে নেমে সে কুল কিনারা পায়না, কোথায় তার মামার বাসা, কোথায় খুঁজবে? শুধু জানে তা মামা থাকে মতিঝিলের কাছে ফকিরাপুল নামে এক জায়গায়।
দু একজন কে জিজ্ঞেস করার পর বুঝতে পারে বেশি দূর নয়, হাঁটা দূরত্ব। সে হাঁটতে থাকে কিছু দূর জাওয়ার পর আরেকজনকে জিজ্ঞেস করে। লোকটি বলে সহজ রাস্তা হলো কালবাট রোড় ধরে হাটা দিয়ে পানির টাঙ্কির কাছে চলে যান, সেখানে গিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করলে ফকিরাপুল দেখায় দিবে।
সাত আট মিনিটের মতো হাঁটার পর সে আবিষ্কার করে পানির টাঙ্কি, হাঁটতে হাঁটতে সে চিন্তা করে কী আজব শহররে ভাই, অমুক রোড়, তনুক রোড় কী সব আজব নাম! সেখানে গিয়ে চা দোকানী কে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দে ফকিরাপুল। ফকিরাপুল যাওয়াট পর তার বহুল কাঙ্ক্ষিত ঠিকানা খুঁজে পায়, খুঁজে পায় তার মামাকেও।
মামার সাথে রুমে ডুকে দেখি চারদিকে গিন্জিগিন্জি ভাব। দেয়ালে পুরনো শ্যাওলা, চুন খসে পড়ছে প্রায়। দেয়ালের একদিকে মস্তবড় একটা পেরেক ঠোকা আছে। পেরেকের একটু নিচে কয়েকটা কাট দিয়ে আলমিরার মতো জোড়া লাগানে আছে।
আলমিরার কাছ থেকে নানান বস্তু ও মানুষের গন্ধ পওয়া যাচ্ছে, যারা ইতোপূর্বে এই রুমে ছিলো, কালের সাক্ষী হয়ে। এই বেহায়া অলস গন্ধ টাকে কেউ তাড়াতে পারেনি মনে হয়।
শরীরের গামের গন্ধ, পুরনো রোগের গন্ধ, মুখের গন্ধ, পায়ের গন্ধ পঁচে যাওয়া তেলের গন্ধ, ইতোপূর্বে মরে যাওয়া কিংবা বেঁচে যাওয়া মানুষের গন্ধ সবই তপনের গেঁয়ো নাকের চিদ্রূ দিয়ে ডুকছে আর তলপেটে মুচড়ি দিয়ে বমি আসার উপক্রম।
বুয়ার হাঁড়িপাতিল নাড়ার শব্দে চৈতন্য ফিরে আসে তপনের। পোড়া ডিম ভাজির গন্ধ, পেয়াজের গন্ধে টের পাওয়া ক্ষুধার গন্ধ ও। যে ক্ষুধার গন্ধ শহর আর গ্রাম সব জায়গায় এক আর অভিন্ন। পোড়া ডিম ভাজি, আর আলুর ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে খেতে সে ভাবে এই পৃথিবীতে গরীবের ক্ষুধা ধ্রুবক, দেয়ালে ঠোকা পেরেকটার মতো!
Source:Pixabay