সোনালী রোদ গুলো বারান্দার গ্রিল ধরে দোল খায়, কিছু রোদ বেলি ফুল গাছটার সবুজ পাতার সাথে লুকোচুরি খেলায় মত্ত। এদিকে ভেন্টিলেটরে চুঁড়োই পাখির সংসার ভালোই চলতেছে। তবে মাঝেমধ্যে কয়েকটি শালিক পাখি এসে ওদের বিরক্ত করে৷ মনে হয় পরো ক্রিয়া করতে চায়, পুরুষ চুঁড়োই পাখির অবর্তমানে!
এইসব দেখেই সময় পার করেন মতিউর সাহেব।
সরকারী চাকরিজীবীদের অবসর জীবন বেশ কষ্টের আর একাকিত্বে ভরা। মতিউর সাহেব বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক উপপরিচালক, অবসর নিয়েছেন প্রায় দেড় বছর হতে চললো। আর্থিক অবস্থা বেশ ভালোই। অবসরের ওর গ্রামের বাড়িতে এসে সুন্দর দোতলা বাড়ি তুলছেন। সাথে শানবাঁধানো পুকুর ঘাট, নানারকম ফলের গাছ দিয়ে ভরা বাগান।
জমিজমাও নেহাত কম নয়, বাপদাদার আমলে জায়গা জমির সাথে নিজেও বেশ কিছু কিনে রাখছেন। জমিজমা, পুকুর, ফলমূল বিক্রির টাকা দিয়েই মতিউর সাহেবে সংসার বেশ আরামছে চলে যায়। পেনশনের টাকায় হাত দিতে হয়না বললেই চলে
তারউপর ছেলেমেয়ে দু'জনেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেটেল্ড।
জানালার পাশ ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকা কড়ই গাছটির দিকে তাকিয়ে আনমনে মতিউর সাহেব ভাবতেছেন যখন চাকরিতে ছিলেন তখন এতে একাকিত্ব লাগেন এখন যতোটা লাগে। তখন হয়তো টাকা পয়সা এতে ছিলোনা কিন্তু মনে সুখ ছিলো ঘরভর্তি মানুষ ছিলো। এমন দিনো গেছে বাসায় গেস্ট আসলে নিচে ফ্লোরিং করে থাকতে হতো ওনার দিলু রোডের বাসায়।
আজ টাকা পয়সার অভাব নেই পুরো দোতলা বাড়িই খালি পড়ে আছে অথচ থাকার মানুষ নেই! ছেলেমেয়েরা যখন দেশে বেড়াতে আসে তখন মতিউর সাহেবের আনন্দ মনে হয় আকাশ ছুয়ে যায়।
নাতি-নাতনীদের নিয়ে বেশ সময় কেটে যায় চোখের পলকে। ওরা যাওয়ার সময় আবার মন খারাপ হয়ে যায়। মতিউর সাহেবের মনের অবস্থা অনেকটা শূন্য নীড়ের মতো মনে হয়। চুঁড়োই পাখিগুলো যখন বাচ্চা ফুটিয়ে বড়ো করে চলে যায় একলা বাসা রেখে ঠিক তেমন।
বেলি ফুল গাছে পানি দিতে দিতে মতিউর সাহেব ভাবে আচ্ছা ওর ছেলেমেয়েদের অবস্থা ও কী এমন হবে? তার নাতি-নাতনীরা ও কী বড়ো হলে যে যার মতো করে থাকবে বাবা-মাকে একা রেখে!
ছেলেমেয়েরা যখন ফোন করে মতিউর সাহেবদের খবর নেন, টাকা পয়সা পাঠানোর কথা বলে, বা কী লাগবে জিজ্ঞেস করে তখন মতিউর সাহেব বলে আমাদের কিছুই লাগবেনা শুধু তোমরা চলে এসো!
ওপাশ থেকে ইথারে ভেসে বসে বাবা এখনতো তোমার নাতি-নাতনীরা স্কুলে ভর্তি হইছে এখন তো আসা যাবেনা, ইত্যাদি।
মতিউর সাহেব উত্তর দে তোদেরকে তে আমি ঢাকার স্কুলে পড়িয়ে আমেরিকার উপোযোগী করে মানুষ করছি, তাহলে সমস্যা কোথায়? ওপাশের তরঙ্গ সঞ্চার থেমে যায়। কিংবা ব্যস্ত হয়ে যায় অন্য কোন যুক্তি খুঁজতে!
Source Pixabay