কামরাঙা গাছের ছোটছোট পাতা গুলো বাতাসে যখন দোল খায় তখন বকুলের মনে পড়ে যায় তার গ্রামের বাড়ির কথা। বাড়িতে থাকতে সে দড়ি দিয়ে বেঁধে দোলনা বানাতো, সে দোলনায় তার ছোট ভাই রাফিকে নিয়ে দোল খেতে হারিয়ে যেতো অনাবিল আনন্দে। আজ দুই মাস হলো সে তার ছোট ভাই, মা-বাবা, স্কুলের অন্য সাথীদের ছাড়া আছে।
বিকেলের রোদ গুলো যখন কামরাঙা গাছের পাতাদের সাথে লুকোচুরি খেলে তখন বকুল তার ফোকলা দাঁত বের করে হেসে কুটকুট হয়ে যায়। বকুল দুই মাস ধরে আছে জহিরুল ইসলামের বাসায়। জহিরুল ইসলাম দেশের প্রথম সারির শিল্পপতি। বকুলের মাও জহিরুল সাহেবের গ্রামের বাড়িতে কাজ করে। বকুলের চঞ্চলতা, কথা বলা, পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ক্যাপাসিটি, ছোট ভাইয়ের প্রতি যত্ন ইত্যাদি দেখে জহিরুল সাহেব বকুলকে নিয়ে আসে বাসায় তার ছোট ছেলেকে সঙ্গ দেয়ার জন্য।
প্রথম যেদিন ঢাকায় আসে হকচকিয়ে যায় বকুল চারদিকে এতো এতো স্থাপত্য এর পাশাপাশি রঙবেরঙের আলো দেখে। জহিরুল সাহেব অন্য অনেক শিল্প প্রতিদের মতো নয়! অন্য কেউ হলে বকুলকে নিজের সাথে ঢাকায় আনতেন না। আনার জন্য বকুলের মা-বাবা কে অতিরিক্ত কিছু টাক দিয়ে আসতেন, বকুলকে ঢাকায় নিয়ে আসার জন্য।
জহিরুল সাহেবের একটাই কথা আল্লাহ আমাকে সুযোগ দিছে, এখন আমি যদি মানুষের জন্য না করি তাহলে আর কে করবে? আল্লাহ তো আমাকে দিনমজুর ও বানাতে পারতেন।
বকুলকে প্রথম প্রথম দেখতে পারতোনা জহিরুল সাহেবের স্ত্রী জোহরা বেগম। জহিরুল গরিব, নিম্নবিত্তদের দেখতে পারলেও ওনার স্ত্রী হলো ওনার বিপরীত। যতোই না দেখতে পারুক, জহিরুল সাহেবের সামনে কথা বলার সাহস এই জীবনে পাবে কি-না সন্দেহ।
বকুলের খিলখিল হাসিতে জোহরা বেগম বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে, বকুল এইভাবে হাসছিস কেনো? তখন তার ছোট ছেলে আরমান বলে মা বকুল আপা রোদেদের লুকোচুরি দেখে হাসতেছে। আরমানের কথায় কিছুটা হকচকিয়ে গিয়ে জোহরা কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেলো।
কয়েকদিন জোহরা বকুলকে ফলো করে বুঝতে পারে এই মেয়ে তার প্রতিবন্ধী ছেলের জন্য এক প্রকার মেডিসিন।
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময় জোহরা বেগম বকুলকে ও নিয়ে যায়, ডাক্তার তার ছোট ছেলেকে দেখে জোহরা বেগমকে বললো, আপনার ছেলেতো এখন আগপর চেয়ে অনেকটা সুস্থ ও স্বাভাবিক। ডাক্তার জিজ্ঞেস করে বাসায় ওনারা কি কি করেন আরমানের সঙ্গে। জোহরা তখন বকুলকে দেখিয়ে বলে সবইতো ও-ই করে। ডাক্তার বকুলের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলো এই মেয়ে ওনেক বুদ্ধিমান, ওনেক জ্ঞান রাখে।
ডাক্তার জোহরা বেগমকে বলে বকুলকে আপনার কাছে রেখে দেন এই মেয়ে একদিন অনেক বড়ো হবে, তাছাড়া আপনার ছেলেও একটা বোন পেলো।
তারপর থেকে জোহরা বেগম আমূল বদলে গেলো, বকুলকে স্কুলে ভর্তি করপ দিলো, মা-বাবার নামের স্থানে নিজেদের নাম লিখে দিলো। এতে করে জহিরুল সাহেবের বুকের উপর থেকে ও অনেক বড়ো পাথর সরে গেলো। যে পাথর অনেকদিন ধরে বয়ে বেড়াচ্ছিলো জহিরুল সাহেব।
Source Pixabay