আজকে চীনের নবজাগরণ নিয়ে লেখাটা শেষ করবার প্রত্যয় নিয়ে লিখতে বসেছি গত দুই পর্ব থেকে এটা পরিষ্কার যে চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর মধ্যে মাও সে তুং ও দেং জিয়াওপিং উভয়ের সংমিশ্রণ পরিলক্ষিত।
তবে চীনা অর্থনীতি আধুনিকায়নের দেং জিয়াওপিং যতটা শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করেছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি কে ততটা নমনীয় বা শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে না। সেটা দক্ষিণ চীন সাগর ও লাদাখে চীনের আগ্রাসী মনোভাবই দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায়।
গেলো বছর রাস্তা নির্মাণকে কেন্দ্র করে ভারত-চীন সীমান্তবর্তী গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সৈন্যদের মাঝে দ্বন্দ্বে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়। চীনা সৈন্যরা হাতিয়ার হিসেবে রড ও পেরেকের তৈরি দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে দাবি করে ভারত যদিও এই উপত্যকায় যেকোনো প্রকার আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ। চীনা সৈন্যদল কতটা আগ্রাসী হয়ে উঠেছিল বোঝাই যাচ্ছে।
চীন ও ভারত এশিয়া অঞ্চলে প্রধান দুই শক্তি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র। এশিয়া অঞ্চলে নিজেদের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে চাপে রাখতে ঐতিহাসিককাল থেকেই ভারতের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র পাকিস্তান কে নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়ে আসছে। এছাড়া নেপাল-ভারত সীমান্ত দ্বন্দ্বেও চীন নেপালকে সমর্থন যোগাচ্ছে। সম্প্রতি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নেওয়া সামরিক সরকারকেও সমর্থন দিচ্ছে চীন।
অপদিকে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের হয়ে চীন বাংলাদেশকে সান্ত্বনার বাণী শোনাচ্ছে এবং বাংলাদেশকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে বিনিয়োগসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে সহায়তা করছে। চীন সহজেই এ অঞ্চলে এক বৃহৎ শক্তিতে পরিণত হচ্ছে মূলত এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলো আয়তন, অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিতে চীনের চেয়ে যোজন যোজন কম হওয়ায় খুব সহজেই তাদের হাতে রাখতে পারছে চীন। এশিয়া অঞ্চলে ভারতের পক্ষে চীনের এমন দৃঢ় অবস্থানকে টপকানো সম্ভব হবে না বলেই ধরে নেয়া যেতে পারে।
এ তো গেলো প্রেসিডেন্ট শি নেতৃত্বাধীন চীন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে এশিয়ায় কতটা শক্ত খুঁটি গাড়তে সক্ষম হয়েছে সেই আলোচনা। এবার দেখা যাক প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এশিয়ার বাইরে কতদূূূর এগিয়েছে।
২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চীনের রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেই এক বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ হাতে নেন, যা বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নামে পরিচিত। চীন সরকার এই পরিকল্পনায় আওতাভুক্ত করেছে বিশ্বের প্রায় ৭০ টি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা, ৬৫ শতাংশ জনসংখ্যা এবং ৪০ শতাংশ জিডিপি। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, চির প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে বিশাল এই কর্মযজ্ঞে অন্তর্ভুক্ত করেনি চীন। তার জবাবে বি আর আই প্রকল্পকে চীন কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক হিসেবে আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মিত্র দেশ জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে সম্প্রতি ব্লু ডট নেটওয়ার্ক (বিডিএন) প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বি আর আই প্রকল্পের প্রতিউত্তরে আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক দেশ ভারতও প্রাচীন ভারতীয় কটন রুটকে পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিলো, যদিও সে উদ্যোগ খুব বেশি আশার আলো দেখাতে সমর্থ হয়নি।
ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক প্রতিউত্তরেই বোঝা যায় প্রেসিডেন্ট শি এর বিআরআই প্রকল্প এশিয়া অঞ্চলে এবং পশ্চিমে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোকে যে ক্রমশ দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তুলেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন আঞ্চলিক দেশগুলোয় অবকাঠামোগত উন্নয়নে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ করছে। এশিয়ো আবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা (AIIB), ৯৯ বছরের জন্য শ্রীলঙ্কার হাম্বান্টোটা পোর্ট লিজ নেয়া, জিবুতিতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনসহ নানাবিধ অর্থৈতিক ও সামরিক কর্মকাণ্ড চীনের প্রভাবকে বিশ্বব্যাপী আরো প্রসারিত করে তুলেছে, যা প্রতিদ্বন্দী দেশ গুলোকে নড়েচড়ে বসতে এক প্রকার বাধ্য করছে।
যদিও বর্তমানে বাণিজ্য যুদ্ধ স্থিতিশীল পর্যায়ে আছে কিন্তু বিগত ট্রাম্প শাসনামলে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধ অনেক গুলো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সামনে নিয়ে এসেছে যেমন- প্রযুক্তি স্থানান্তর, ডেটা নিরাপত্তা, সাইবার যুদ্ধ, চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘন ইত্যাদি। তথাপি উক্ত বিষয়গুলোর কোনো সমাধান হয়নি এখন পর্যন্ত। তাই এসব ইস্যু যেকোনো মুহূর্তেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
চীনে পূর্বের দশক গুলোয় শি জিনপিং এর কমিউনিস্ট পার্টিতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ছোটখাটো দ্বন্দ্ব বা অস্থিতিশীলতা দেখা যেতো। এছাড়া তিব্বত ও হংকং ইস্যুতেও বিরাজমান করছিলো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। আবার হংকং ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদও ছিল। ফলে এসব অস্থিতিশীলতার কারণে পরাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে চীনের এককভাবে যতখানি মনোযোগ নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামরিক সক্ষমতার উপর দেয়া দরকার ছিলো হয়ত ততখানি দেয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর নেতৃত্বে গত প্রায় এক দশক ধরে চীনের রাজনৈতিক অবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ স্থিতিশীল বলা চলে। দেশের অভ্যন্তরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় মাঝে মাঝে জনগণ দ্বারা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচিত হওয়া ছাড়া কমিউনিস্ট পার্টিতে কোনো ভিন্নমত বা বিদ্রোহ দেখা যায়নি। তাই এখন নিজেদের অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির দিকে চীনের সম্পূর্ণ মনোযোগ। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রকে হংকং ইস্যুতে কিছু বলতে গেলেও কিছুটা ভেবেচিন্তে বলতে হবে কারণ চীনের সাবেক রাষ্ট্র প্রধানদের তুলনায় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অনেক বেশি আক্রমণাত্বক।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকেরা চীনকে বরাবরই দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হিসাবেই দেখে সেটা ক্ষমতায় রিপাবলিকান থাকুক বা ডেমোক্র্যাটস। চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও "গ্লোবাল হেজেমনিক থ্রেট" হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন, বর্তমান বাইডেন প্রশাসনও যার সাথে একমত। সম্প্রতি কৌশলগত প্রতিযোগিতা আইন-২০২১ (Strategic Competition Act-2021) কে মার্কিন সিনেটের বিদেশ সম্পর্কিত কমিটি সমর্থন জানিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং সামরিক সুরক্ষাসহ একাধিক ক্ষেত্রে চীনকে কৌশলগত প্রতিযোগী হিসাবে চিহ্নিত করেছে। তবে ট্রাম্পের সময় বিশ্ব যেমন দুই দেশের মধ্যে লাগাতার বাণিজ্য আগ্রাসন দেখেছিলো , হয়তো সেটা এখন কিছুটা কমে আসবে। অন্যদিকে পশ্চিমাদের সাথে রাশিয়ার শীতল সম্পর্ক, চীনের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ককে উত্তরোত্তর উষ্ণ করে চলেছে। বর্তমানে চীন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।
প্রেসিডেন্ট শি চীনকে বিশ্বের প্রধান পরাশক্তিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে যে বিশাল কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন তা বাস্তবায়ন হলে বিশ্বে বড় ধরণের রাজনৈতিক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশ্লেষকগণ মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্বপূর্ণ পুঁজিবাদী ইউনিপোলার বিশ্বব্যবস্থায় সমাজতান্ত্রিক চীনের অভ্যুত্থানে বিশ্বব্যবস্থায় মতাদর্শগত পরিবর্তন আসতে বাধ্য।
হয়তো এর জন্যই বহু বছর পূর্বে নেপোলিওন বোনাপার্ট বলেছিলেন, "Let China sleep, for when she wakes she will shake the world" (চীনকে এখন ঘুমাতে দাও, যখন সে জেগে উঠবে সে পুরো বিশ্বকে চমকে দিবে)।
২০৪৯ সালে সমাজতান্ত্রিক গণচীনের ১০০ বছর পূর্তিতে বি আর আই প্রকল্প চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হলে নেপোলিয়নের উক্তিটি হয়ত সম্পূর্ণরূপে বাস্তবে পরিণত হতে দেখবে বিশ্ববাসী।