আমার পড়া এক বাস্তবমুখী উপন্যাস

Words
579
Reading
3 min
Listen
Play
5y

আমার বন্ধুর উপহার দেওয়া উপন্যাস,আমি ততো উপন্যাস পড়িনা,কিন্তু যেহেতু বন্ধুর দেওয়া তাই পড়তে হয়েছে,এই উপন্যাসের সব জিনিস আমাকে খুব ভালো লেগেছে।
উপন্যাসটা আমাদের সমাজ নিয়ে, সমাজের নাজুক একটা দিকের স্বরূপ লেখক কলমের খোঁচায় স্পষ্ট করেছেন। লেখকের ভাষায়, 'মরণোত্তম আসলে প্রচণ্ড এক চপেটাঘাত। ঠুলি পরে থাকা অসংখ্য অন্ধ চোখে আঙুল পুরে দেওয়া।'
moronottom.jpg

আর ঐ একটা দিককে আঘাত করতে যেয়ে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছেন আরো কয়েকটা নাজুক দিক।

বিচারহীনতার এই দেশে ধর্ষকদের বিচার হচ্ছে না। কিংবা ফেসবুকের যুগের মানুষদের অসারতা,স্থুলতা, বাতুলতা, অপরিপক্ব আগ্রহ- তারা কতটা অন্যায়ের বিচার প্রকৃতভাবে চায়- আর কতটা চায় হুজুগে- সবকিছুই আছে এতে। আছে দূর্বলের প্রতি সবলের অত্যাচার। এই সমাজের নৈতিক স্খলনের বিভিন্ন দিককে ইঙ্গিত করে লেখা এই উপন্যাসের মূল কথা- বর্তমান সমাজে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াটাই ভাল, বেঁচে থেকে এখানে কিছু হয় না। বরং একটা করে মৃত্যু হয় আর সেই মৃত্যুর বিনিময়ের সমাজের টনক নড়ে।
_109085388_bannerimage.jpg
খুব নির্জলা সত্য কথা, আমাদের চোখের সামনে এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে। এই ঘরানার সাহিত্য আজকাল অপ্রতুল, লেখককে সাধুবাদ জানাতেই হবে।
যদি আপনারা উপন্যাসটা পড়তে চান,তাহলে নিচে লিংক দেওয়া আছে বইটিরঃhttps://drive.google.com/file/d/1_D3ffcAJ-fwgMENWVur6FiErVlc3wtgT/view?usp=drivesdk

উপন্যাস পড়তে গিয়ে পাঠক হিসেবে মনে একটা প্রশ্ন আসে, ৯৩ পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত এই উপন্যাসটা আমাদের যা বোঝাতে চায়- তার জন্যে ৯৩ পৃষ্ঠাই কি বেশি হয়ে যায় না? আজিজ মাস্টার ও আসাদ নামে একজন কবির কথোপকথনই এই উপন্যাসের মূল চালিকাশক্তি হয়ে স্পষ্ট হবে পাঠকের সামনে। যেই কথোপকথন কিছু কিছু জায়গায় হয়তো প্রয়োজনেই ছিল বেশ নীরস। উপন্যাসটা কেবল ৯৩ পৃষ্ঠা বলে উপন্যাসটা পড়ে ফেলা যায় একটানে। আর খানা কতেক পাতা যদি বেশি হতো তাহলে পাঠক হয়তো এই দারুণ বার্তাবাহী উপন্যাসেও অসহিষ্ণু হয়ে উঠতো! একটা উপন্যাস না হয়ে একটা আখ্যানমূলক জমজমাট ৩০-৩৫ পাতার গল্পও কিন্তু হতে পারত এই প্লট৷
IMG_20210426_235538.jpg

উপন্যাসটা শুরু থেকে শেষপর্যন্ত পাঠক একটা বৃত্তের বাইরে থেকে পড়ে যাবেন। হৃদয়গ্রাহী ঝরঝরে লেখা তাকে বৃত্তের ভেতরে ঢোকার আমন্ত্রণ জানাবে, পাঠক ঢুকতেও চাইবেন। কিন্তু উপাদানের অভাবে বৃত্তের বাইরে থেকেই পাঠককে শেষ করতে হবে উপন্যাসটা। তারপরেও এই উপন্যাস আমাদের সমাজের বর্তমানের প্রকট একটা সমস্যা যেভাবে চোখে আঙুল দিয়ে পাঠককে দেখাবে- তা ঔপন্যাসিকেরই কৃতিত্ব, গৌরব।

পাঠককে উপন্যাস পড়ার সময় কমিক রিলিফ দিতে আজিজ মাস্টারের স্বপ্নে চলে এসেছেন তার বাবা। আজিজ মাস্টারের বাবার সাথে তার কথোপকথন পাঠককে আনন্দ দিবে।

21e284ee7_194718.jpg

-- তুই ঢাকায় যাচ্ছিস কেন?
-- স্কুল বাঁচাতে।
-- স্কুলের কি পরাণ আছে নি যে মরণ-বাঁচন থাকবো?
-- জি আব্বা আছে।
-- ঢাকায় গেলে স্কুল বাঁচবে?
-- চেষ্টা করতে দোষ কী?
-- চেষ্টা করতে দোষ নাই। কিন্তু অযথা চেষ্টায় সময় নষ্ট।
-- কোন চেষ্টাই অযথা না আব্বা।
-- অবশ্যই অযথা। এই যে বাসে করে ঢাকায় যাচ্ছিস, এখন এই বাস যদি রাস্তার মাঝখানে বন্ধ হয়ে যায়, আর তুই একা যদি সেই বাস ঠেলে ঢাকায় নেওয়ার চেষ্টা করিস, তাহলে সেই চেষ্টা অযথা হবে না?

আসাদ চরিত্রটির সংলাপে পাঠক খুব আগ্রহ এবং আনন্দ খুঁজে পাবেন নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

-- সাংবাদিকদের খবর দিতে হবে। চা-বিস্কুট খাওয়াতে হবে। যাওয়ার সময় হাতের ফাঁকে সামান্য টাকাপয়সাও গুঁজে দিতে হবে। এইটারে আবার ঘুষ ভাইবেন না স্যার। এইটা হলো তাদের আসা-যাওয়ার খরচ। ভাড়া বা নিজেদের গাড়ির তেলের খরচ। নিজেদের গাঁটের পয়সা খরচ করে তারা আপনার সংবাদ কভার করতে কেন আসবে বলেন? সবকিছুরই তো একটা সিস্টেম আছে, আছে না?

এই দুইটি সংলাপসহ উপন্যাসের বিভিন্ন অংশের লেখনশৈলীর সাথে আমার মনে হয়েছে আমরা পাঠকেরা পরিচিত। এ ধরণের লেখনশৈলী আমাদের আকর্ষণ করে অনেক আগ থেকে। লেখক সাদাত হোসাইনের জনপ্রিয়তা দেখে হয়ত এই কথা বলার আর উপায় নেই, তিনি এ ধরণের লেখনশৈলী দ্বারা প্রভাবিত। বরং অনেক পাঠক এই কথা বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন যে, তিনি নিজেও এই ধরণের লেখনশৈলীর অংশীদার।

উপন্যাসে ব্যবহৃত কবিতার লাইনটা দারুণ পছন্দ হয়েছে। সেই লাইনটা দিয়েই শেষ করি-

"সেই সে মিছিলে, তুমিও কি ছিলে, নাকি ছিল শুধু একা কেউ?
জেনে রেখো আজ, একা এ আওয়াজ, হবে শত সহস্র ঢেউ

আমার পড়া এক বাস্তবমুখী উপন্যাস | Ecency