ওমানে যতগুলো শকলা (বাসাবাড়িতে যারা কাজ করে) আছে তাদের মধ্যে সিংহভাগই সম্ভবত বাংলাদেশের নারীরা। আর্থিক অবস্থার টানাপোড়ন থেকে মুক্তির খোজে বিধবা কিংবা স্বামী আছে এমন মহিলারাও বিদেশ খাটতে আছে। সবাই যে আশানুরূপ কাজের ক্ষেত্র (বাসাবাড়ি) পায় তাও না। খুব অল্প ক্ষেত্রেই ভাল স্পনসর মেলে যারা কাজের মহিলাকে মানুষ হিসাবেও ট্রিট করে। বেশীরভাগেরই জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। কিন্তু ততক্ষনে হয়ে গেছে অনেক দেরী। মুখ বুজে পড়ে থাকা ছাড়া তাদের আর কোন গত্যন্তর থাকে না। গতকাল সেরকমই একজন বাংলাদেশী মহিলা এসেছিল আমার চেম্বারে।
ধরে নেয়া যাক নাম তার আশা বেগম। পতাকা রেকর্ড অনুযায়ী বয়স তার ৩৫ বছর। গত ৯ বছর ধরে ওমানে আছে। একটা বাসাবাড়িতে কাজ করে। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি একবার আমার চেম্বারে এসেছিল। সাধারণ দুর্বলতা, মাথা ঘুরানো, শ্বাসকষ্ট এবং বুকে ব্যথা নিয়ে। এরপর থেকে আরো ৫ বার আমাদের ক্লিনিকে এসেছে। কখনো আমার কাছে, কখনো আরেকজন ডাক্তারের কাছে। সমস্যা একই রকম। মূল সমস্যা শ্বাসকষ্ট। গতকালকেও যখন এসেছিলেন, দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছিল তার। তার সাথে ছিল অন্য একজন মহিলা। অন্য আরেকজন শকলা, কোন ওমানী ছিল না তার সাথে।
রোগীর ভাষ্যমতে, কোন অসুস্থতার জন্য সহজে কোন ক্লিনিকে নেয় না তার স্পনসর । অনেক বলার পর হয়তো কোন ক্লিনিকে নিয়ে যায় কিন্তু চিকিৎসা খরচ কখনোই দেয় না। ১২০ ওমানি রিয়াল বেতন পায়। পোশাক-আশাক, কসমেটিকস, চিকিৎসা খরচ সবই নিজের, শুধু খাবারটাই ফ্রি পায়।
স্বামী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১৪ বছর আগে। কোন ঘর-বাড়ি বানিয়ে দিয়ে যেতে পারেনি বউ আর ৩ বাচ্চার জন্য। স্বামী মরার পর তার ঠায় মিলেছে বাপের বাড়িতে ৩ বাচ্চা সহ। ঠায় বলতে মাথা গোজার একটা জায়গা শুধু মাত্র। ৪টা মুখের খাবার দেবার মত সামর্থ্য নেই তার বাবা কিংবা ভাইয়ের। তাই ৯ বছর আগে পাড়ি জমিয়েছিল ওমানে। ছেলে মেয়েদের ডিটেইলস জানা হয় নাই। তবে তাদের মুখের দিকে তাকিয়েই পড়ে আছেন এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে।
যাহোক, তার সমস্যা অনুযায়ী চিকিৎসা দিলাম। চেষ্টা করলাম যতটুকু সাহায্য করা যায়। আশা করি (এবং দোয়া করি) ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে তার দুঃখ ঘোচাবে।