ব্যাকরনের মাস্টার
আজ হঠাৎ কি যে হলো? মাকে ছেড়ে ওই অত দূর থাকতে তো একদম পারবো না। ভাবতেই দম বন্ধ লাগছে। রোকেয়াকে ডেকে একটু পানি দিতে বললাম।
পানি টা খেয়ে গ্লাস টা পাশে রাখতে রাখতেই গত চার বছরের স্মৃতিগুলো চোখে ভেসে উঠলো।
মা শুধু ওনার একটা ব্যাপার এ একটু অখুশি ছিলেন। উনি বেশিরভাগ সময়ই খাঁটি সাধু ভাষায় কথা বলতেন। আমি আর আমার মা কেউই সেই কথার এক অক্ষরও বুঝতাম না। কিন্তু আমার মায়ের অনেক শখ ছিল তার মেয়ে অনেক রকমের ভাষায় কথা বলার ক্ষমতা রাখবে। মায়ের এই শখ আমার শনি ডেকে আনলো। আমাকে নিয়ে ওই লোকের কাছে সাধু ভাষা শেখানোর কথা বললেন আমার মা। লোকটা একটু সময় নিলো ভাবতে তবে রাজি হয়ে গিয়েছিল।
এরপর থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ওনার কাছে এই সাধু ভাষায় কথা বলার দক্ষতা অর্জন করতে একরকম জোর করে যেতে হতো আমার। কি যে বিরক্ত হতাম তখন। মা কথা কানেই তুলতো না। ওনার সেই এক কথা, ওই পাগল লোকটার মতো আমাকেও সাধু ভাষায় কথা বলা শেখা লাগবে।
এইভাবে ওই পাগল লোকটার পাগলামির প্রেমে কখন যে পড়ে গিয়েছিলাম আমি, টের পাইনি একদম! তিনি বেশিরভাগ সময়ই ওই উটকো ভাষায় কথা বলতেন, আমি কিছুই বুঝতাম না প্রথম দিকে। আস্তে আস্তে বুঝলাম। সময় লাগলো প্রায় ছয় মাস! এরপর আমিও কোনরকম আধা ভাঙ্গা সাধু ভাষায় কথা বলতে পারতাম। একদিন বিকেলে গাছে পানি দিতে ছাদে গেলাম। দেখলাম একটা টবের তলায় সাদা একটা কাগজ। উঠিয়ে নিয়ে কাগজটার ভাঁজ খুলতেই চোখে পড়লো"তোমার এই সাধু ভাষা শিখতে খুব বিরক্ত লাগে,তাই না?"
আমি অবাক হলাম একটু। কোনোদিন তো ওনাকে বলি নি আমার বিরক্তির কথা। কিভাবে জানলো কে জানে। অত মাথা ঘামালাম না।
সেই প্রশ্নের একটা উত্তর দিয়ে রাখলাম ওই টবের তলায়। লিখেছিলাম " আপনার কি তাতে?" এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিন সকালে মাস্টার মশাই একটা করে চিরকুট রেখে যেতেন আর আমি বিকেলবেলায় গিয়ে সেগুলোর উত্তর দিয়ে আসতাম। এরপর তিনি ফন্দি আঁটলেন চিরকুট লিখবেন সাধু ভাষায় যাতে আমার শিখতে আর চর্চা করতে আরেকটু সুবিধে হয়! আমার তখন উত্তর দিতে ভারী বিরক্ত লাগতো। এই কারণে টানা এক সপ্তাহ আর কোনো উত্তর দিলাম না ওনার চিরকুটের। একদিন সন্ধ্যে বেলায় ওনার কাছে পড়ছি। হঠাৎ উনি এক গ্লাস পানি চাইলেন। আমি পানি আনতে গেলাম আর এই ফাঁকে তিনি এক টুকরো কাগজ ছোটো করে লিখলেন "sorry"
আমি পানি নিয়ে আসতেই কাগজটা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন " আজ ছুটি"। তারপর আমাকে কিছু বুঝে উঠার সুযোগ না দিয়েই চলে গেলেন কোথায় যেন। আমি বাড়ি ফিরে কাগজটা খুলে লিখাটা দেখে সেদিন এত হেসেছিলাম। উনি কিভাবে বুঝেছিলেন যে আমি বিরক্ত হয়ে ওনার চিরকুটের উত্তর দেইনি, আমি জানি না। কিন্তু ভালই হয়েছে। এখন আর সাধু ভাষায় কিছু লিখতে হবে না আমার, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
তার কাছে পড়ছি প্রায় চারমাস, হঠাৎ একদিন আমাকে বললেন ওনাকে আমার কেমন লাগে। আমি বললাম "পাগল কবিদের মতো"। এই উত্তর শুনে তিনি এত অবাক হয়েছিলেন আর সেটা দেখে আমি হেসে গড়াগড়ি। উনি সেদিন হুট করেই বলেছিলেন" তোমার হাসিটা সুন্দর" লজ্জা পেয়েছিলাম খুব, এরপর থেকে ওনার সামনে তেমন হাসতাম না আমি। মাস্টার মশাই বলতে বলতে কবে যে ওনাকে বন্ধু বানিয়ে নিয়েছিলাম বুঝতে পারি নি নিজেও। সারাদিনের যত গল্প আমি তাকে বলবো বলে জমিয়ে রাখতাম। আর সে এত মন দিয়ে শুনত সেইসব। মাঝে মধ্যে তার ধৈ্য্য এর কথা ভেবে নিজেই অবাক হয়ে যেতাম!
ভীষণ কষ্ট হতো, দম বন্ধ করার মতো কষ্ট। বুকের ভেতর মনে হতো কেউ খুব জোড়ে হাতুড়ি পেটাচ্ছে। খাওয়া, ঘুম সব মাথায় তুলেছিলাম। কিচ্ছু ভালো লাগতো না তখন। একদম একা হয়ে গিয়েছিলাম নিজে থেকেই। কারও সাথে কথা পর্যন্ত বলতে ইচ্ছে হতো না আমার। নিজের মতো ঘরের একটা কোনে পড়ে থাকতাম। প্রায় অনেকদিন পর একদিন ছাদে গিয়েছিলাম। যেতেই দেখলাম উনি দাড়িয়ে। নেমে আসছিলাম সিড়ি বেয়ে ওনাকে দেখে,ওনার সামনে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল না আর। পেছন থেকে হাত টা ধরে টেনে নিয়ে গেলেন ছাদে । চুপচাপ দাড়িয়ে রইলাম আমি মাথা নিচু করে। মনে হচ্ছিল আমি বিরাট কোনো অপরাধের আসামি।
উনি বলেই ফেললেন" তুমি জানো, কতগুলো দিন ছাদে দাড়িয়ে ছিলাম এসে তোমার জন্য, অপেক্ষা করতাম, যদি আসো সেই আশায়"
" কি এমন করেছি আমি যে আর পড়তে আসো না, কথা বলো না এমনকি দেখতেও চাও না আমাকে"
আমার কিছু বলার ছিল না। খুব কান্না পাচ্ছিল। কাদতে কাদতেই সেদিন বলেছিলাম" আপনি চলে যান, আমাদের মধ্যে কোনোকিছুই সম্ভব না। শুধু মায়া বাড়িয়ে আমি কষ্ট পেতে চাই না"
উনি হেসে ফেললেন। আমি অবাক হয়েছিলাম খুব।
উনি বললেন" তো, এই মাস্টার মশাই কে এই কথাটা বললে কি উনি কানে ধরিয়ে রাখতেন?"
আমি আর কিছুই বলিনি সেদিন। উনি কাছে এসে আমার দুটো হাত ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে সেদিন বলেছিলেন" ভালোবাসি",অপেক্ষা করো আমার জন্য,আমি আসবো।"
একছুটে ছাদ থেকে চলে এসেছিলাম সেদিন। আর তিনি সেদিনই সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। কাউকে কিছুই বলে যায়নি। শুধু চলে গেলেন কোথায় যেনো। এরপর তিনটা বছর তার কোনো খোঁজ ছিল না। কোনো ফোন নম্বর ছিল আমার তার আমার কাছে। কিচ্ছু জানতাম না আমি। শুধু তার কথা রাখতে এত এত বিয়ের প্রস্তাব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম, পড়ালেখায় মন দিলাম, কারও কোনো কথাই আর কানে নিলাম না। মা জোর করেনি আর। হয়তো বুঝেছিল। ঠিক তিন বছর পর, আমি তখন ভার্সিটি তে। একদিন বিকাল বেলায়, আমি আমার ঘরটায় বসে বই পড়ছিলাম। আমার মাস্টার মশাই এর উপহার দেয়া একটা বই। ঠিক তখন,একটা চেনা গলা,
তিনি সেদিন নিজের যোগ্যতা দিয়ে আমাকে চাইতে এসেছিলেন নিজের জন্য। খুব ভালো একটা চাকরি জুগিয়ে আবার এসেছিল আমার কাছে, তার কথা রাখতে। বিয়ের সব আয়োজন শেষ। পুরো বাড়ি এত সুন্দর সাজিয়েছে সবাই। রাত প্রায় নয়টা। আমি আর আমার মাস্টার মশাই ছাদে দাড়িয়ে আছি। এইতো কিছুক্ষণ আগেই কবুল বলে তাকে একবারের মত আমার করে নিয়েছি। দুজন পাশাপাশি দাড়িয়ে নিচে তাকিয়ে আছি। মানুষের হাকডাক কানে আসছে।
আমি হুট করে বললাম" তো,মাস্টার মশাই,আজ আমাকে ব্যাকরণের কোন নীতি শিক্ষা দিবেন আপনি?"
লেখা - ফারজানা আক্তার পিংকি