বাস স্টপের সেই ছেলেটাকে আমার না বলা কথা গুলো
প্রতিদিন আমি কলেজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাস স্টপ গিয়ে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতাম। কলেজ বাস মিস করা আমার কোন নতুন অভ্যাস ছিল না। প্রায় মিস করি আমি , আর বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকি। হঠাৎ একদিন এই ভাবে বাস স্টপ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একটি বাসের মধ্যে একটি ছেলেকে দেখতে পাই। সাদা টি-শার্ট পরে জানালার পাশের সিটে বসে আছে। সেই বাসে একটি পথিক শিশু ছেলেটির কাছ থেকে টাকা চাইছে , সে শিশুটিকে টাকা দিয়ে শিশুটিকে ছেলেটি তার পাশের সিটে বসিয়ে কি যেন হাসিমুখে বলছিল। ছেলেটিও হাসছিল আর পথিক শিশুটিও হাসছিল। আমার কাছে বিষয়টি খুবই ভাল লেগেছিল। হয়তো আমার ছেলেটিকে দেখা সম্ভব হতো না যদি রেড সিগন্যাল না পড়ত। রেড সিগন্যাল ছেড়ে দিতেই বাসটি চলে গেল সাথে সাথে।
কিছু মুহূর্তের জন্য আমি যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম ছেলেটির সেই মায়াময় মুখ দেখে। কি অসাধারণ চাহনি ছিল তার , আর রাস্তার সেই অসহায় শিশুটিকে যেন আপন করে নিয়েছিল ছেলেটি। কেন যেন মনে হচ্ছিল ছেলেটি শুধু আমারই জন্য পৃথিবীতে এসেছে। আমি সেদিন আর কলেজ যেতে পারিনি কারণ আমার কলেজ সময় পার হয়ে গিয়েছিল।
বাড়ি ফিরে শুধু একটাই ভাবনা আমার মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে , ছেলেটিকে কি ভাবে আপন করে নিবো। ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আমি যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম। কোনো কিছুই এখন আর মনে করতে পারছিনা। ছেলেটি কোন বাসে ছিল , আর বাস টিই বা কোথাকার, কি করব কি করব ভাবতেই মাথায় বুদ্ধি আসলো , কাল একই সময় আমি বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকব। যদি ভাগ্যবশত পেয়ে যায়। এভাবে সারারাত ছেলেটাকে কল্পনা করতে করতে কাটিয়ে দিই।
সকালে ঘুম থেকে উঠে মায়ের হাতের নাস্তা খেয়ে বেরিয়ে পড়ি। বাসস্টপে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম , আর মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা কাজ করছিল। তাকে না পাওয়ার চিন্তা কেন যেন মনে আনতেই পারছি না। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আমার সামনে বাসটি এসে দাঁড়ালো আর জানালার পাশে সেই মুখটা। আমার মনটা মুহূর্তেই শান্ত হয়ে গেল। খেয়াল করে দেখলাম সেটা ছিল একটি অফিসিয়াল বাস, তখন বুঝতে আর বাকি রইল না। কিন্তু এখন কি ভাবে কি করবো আমি বুঝতে পারছিলাম না। একটা ছেলের পক্ষে হয়তো একটা মেয়ের কাছে গিয়ে কথা বলা সম্ভব কিন্তু একটা মেয়ের পক্ষে তা সম্ভব না। ভেবে চিনতে কিছু খুঁজে না পেয়ে প্রতিদিন তাকে দেখার জন্য বাস স্টপ দাঁড়িয়ে থাকি।
আমি তাকে দেখার জন্য প্রতিদিন সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলেও সে আমাকে কখনো দেখিনি। কারণ বাস স্টপে অনেক জনমানবের ভিড়ে কখনো সে আমাকে খেয়াল করতে পারেনি। দিন শেষে বাড়ি ফিরে তাকে নিয়েই ভাবতাম। আমার কল্পনার হৃদয় জুড়ে যেন শুধু ওরি বসবাস। কিন্তু না জানি তার নাম আর না জানি তার ঠিকানা। আর না তাকে বলার কোনো সাহস আছে আমার। এভাবেই আমার দিন গুলো কেটে যেত। চিন্তার রাজ্যে হারিয়ে গিয়ে না ঘুমিয়ে আমার চোখের নিচে কালো দাগ পরে যাচ্ছে। এ নিয়ে আমার মা আমার দিকে তাকিয়ে অনেক রাগারাগি করে। আমার নাকি চেহেরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তার কিছুণের মধ্যে আমার ফ্রেন্ড আমার বাসায় আসে আমার সাথে দেখা করতে। সেও আমাকে দেখে অনেক বকাঝকা করতে লাগলো আমি নাকি অনেক চেঞ্জ হয়ে গিয়েছি। আমাকে প্রশ্ন করতে লাগলো আমার কি হয়েছে , কলেজ কেন যায়না। তোর কি সমস্যা আমার কাছে বল। তখন আমি আমার মনের কথা গুলো সব বুঝিয়ে বললাম। যদিও তার আমার কথা গুলো তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো। আমার কথা শুনে সে এক পর্যায়ে বলতে লাগলো তোর এই কষ্ট আমার আর সহ্য হচ্ছে না। কিছু একটা করা দরকার।
আমি বলতে থাকলাম আমার দ্বারা কিছু করা সম্ভব না। আমি ওর সামনে গিয়ে কখনো কথা বলতে পারবোনা। আমার ফ্রেন্ড বলতে লাগলো তুই কোনো চিন্তা করিসনা। তোর সাথে ছেলেটার কথা বলার জন্য সব ব্যবস্থা আমি করে দিবো। আমি তোকে আমার সকল চেষ্টা দিয়ে সাহায্য করবো। চল কাল সকালেই ছেলেটার সাথে দেখা করবো। আমার মনে হয় না তোকে দেখলে ছেলেটা তোকে ফিরিয়ে দিবে।
পরেরদিন সকালে নিজেকে ভালো ভাবে তৈরী করে দুই জন একসাথে বাস স্টপের উদ্দেশে রওনা হয়। ওর সাথে দেখা হবে কথা হবে ভাবতেই আমার বুক ধুক ধুক করছিলো। হয়তো এতদিন যাবৎ যাকে ভালোবেসে এসেছি তার সামনে যাবো বলে কিছুটা ভয় লাগছে। আর এটাই স্বাভাবিক।
বাস স্টপে কিছুক্ষন দাঁড়াতেই বাস টি আসলো। আর আমরা দুইজন বাসে উঠে যাই ও সোজা তার সিটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তখন আমার ভয়ে যেন নিঃশ্বাস নিতেই কষ্ট হচ্ছিলো। আমরা ছেলেটার সাথে কিছু বলার আগেই সামনে থেকে একটি রড বহনকারী গাড়ি হটাৎ হার্ড ব্রেক ধরতেই আমাদের বাস গিয়ে সেই রডের গাড়ির ভিতরে ঢুকে যাই আর সেই রড বাসে থাকা কিছু মানুষের ভিবিন্ন অঙ্গ দিয়ে ঢুকে যাই। আমার ঠিক বুকের মাঝখানে রডটি প্রবেশ করে আর আমি মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ি। আমার এই ছটফট করা শরীরের দুটো চোখ যেন তার দিকেই জ্বল জ্বল করে তাকিয়ে ছিল। কিছুক্ষনের মধ্যে সেখানেই আমার মৃত্যু ঘটে আর আমার না বলা কথা গুলো এভাবেই থেমে যাই।