বেড়ে উঠেছি বগুড়াতে। জানি না জীবনে প্রথম কোন শব্দ উচ্চারন করেছিলাম। হয় তো বাবা, নয় তো মা অথবা দাদা। আমাকে কোন শব্দ প্রথম শেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল সেটাও জানি না। তবে আমি স্পষ্ট মনে করতে পারি- কথা শেখার পর "ভারত আমাদের শত্রু"- এই বাক্যটি আমার একজন নিকটাত্মীয় অনেক চেষ্টা করে মুখস্ত করিয়েছিলেন। আমার মনে আছে সেই আত্মীয় বাবাকে বলেছিলেন- তোমার এই সন্তানকে আমি তার জন্মভূমিতে বসবাসের জন্য সবচেয়ে তিক্ত কিন্তু প্রয়োজনীয় লেসনটি দিয়ে দিলাম।
বগুড়া শাহজাহানপুরে ক্যান্টনমেন্ট আছে। ছোটবেলায় সেই ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে আমাদের গ্রামের এলাকাতে প্রায়শই একটা তথ্য শুনতাম। কোন একদিন (সম্ভবত আশির দশকের ঘটনা) বগুড়া ক্যান্টনমেন্টের ভেতর ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা "র" এর দুইজন এজেন্ট ধরা পড়েছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অনেক বড় র্যাংকেই ছিল। কিন্তু ডিজিএফআইয়ের ফাঁদে ধরা পড়ে সেই এজেন্টদ্বয়। সেই দুই এজেন্টকে ধরে এনে ক্যান্টনমেন্টের পাশ দিয়ে যাওয়া ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের গাছের সাথে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। লাশের বুকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল- "বিশ্বাসঘাতকের পরিনতি এমনই হয়"। প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে দিয়ে বগুড়াবাসীকে জানানো হয়েছিল- সাবধান, দেশ নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করো না।
জানি না এই কথিত ঘটনার আসলে কতটা বাস্তবতা ছিল। তবে আমাদের এলাকায় রাজনীতিবিদরা দেশপ্রেম নিয়ে নসিহত করতে গিয়ে এই আলোচনা প্রায়ই করতেন। আমি মাধ্যমিক পর্যায়ে স্যারদের মুখ থেকেই এই ঘটনা শুনেছি।
ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে আমার সন্দেহ থাকলেও একটা বিষয় মগজে নিয়েই বড় হয়েছি- ভারত আমাদের বন্ধু নয়। ওরা আমাদের উপর আধিপত্যবাদী মানসিকতা নিয়ে ছড়ি ঘুড়াতে চায়। ওরা আমাদের সীমান্তে আমাদের ভাইদের পাখীর মত গুলি করে মারে। ওরা আমাদের যুব সমাজকে ধংস্ব করতে পানির দরে মাদক দ্রব্য সাপ্লাই করে। ওরা আমাদের উন্নত নিজস্ব সাংস্কৃতিক অবস্থানকে এলোমেলো করে দিতে তাদের যৌন প্রধান সংস্কৃতিকে আমাদের বস্তুবাদী মগজে সুকৌশলে ঢুকে দেয়। আমাদের শিক্ষকমন্ডলী আরো বলতেন- রক্তের সাগরে কেনা বাংলাদেশকে ভারত তাদের দান-দক্ষিণা মনে করে। ওরা আমাদের মর্যাদা দিতে জানে না। ওরা নিজেদের প্রভু মনে করে আর আমরা তাদের দাস!
এই শিক্ষা পেয়েই বড় হয়েছি। জানি না। বগুড়ার সকল পর্যায়ের লোকজন পাকিস্থানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইএ' র এজেন্ট কি না। জিয়াউর রহমানের কল্যানে তা হতেও পারে। তবে এটি সত্য বগুড়ার একজন শিশু ভারতকে ঘৃণা করতে করতেই বড় হয়ে ওঠে। বড় হয়ে তার প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশকে রাহুমুক্ত করার প্রচেষ্টার সৈনিক হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
আমিও সেভাবেই বড় হয়েছি। শৈশব, কৈশোর পাড় হয়ে পরিনত বয়সে এসে আমার মতিভ্রম কেটেছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই দেখেছি- ভারতীয় সেবাদাসরা কিভাবে ছাত্রদের মগজে ভারতপ্রেম ঢুকিয়ে দিচ্ছে। কথায় কথায় আমাদের স্যারবৃন্দ ভারত বন্দনায় মেতে উঠতেন। এমন কি ফেলানীর পাশবিক হত্যাকান্ডকে ডিফেন্ড করতে গিয়ে বলা হতো " গরু চোররা মরলেও তোমরা যেভাবে রিএক্ট করো-ফেলানী মরলেও সেভাবেই রিএক্ট করো। " আমি এটা জেনেই বড় হয়েছি যে- বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনী "এন্টি ইন্ডিয়া" কনসেপ্ট লালন করে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। কারণ - বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে কখনো কোন বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়- সেটি হবে ভারত। এটি ভৌগলিক কারনেই ধ্রবসত্য। কিন্তু আমি দেখছি- সেই ভারতকে নিয়েই আমাদের সে কি উচ্ছ্বাস আর উন্মাদনা। সেটি সকল পর্যায়েই।
এখন আবার চেতনার প্যারামিটারের সাথে ভারতপ্রেম অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। মন্ত্রীর ভাষায় "যারা ভারতের শত্রু, তারা বাংলাদেশের শত্রু"। কি সাংঘাতিক ব্যাপার!
সম্ভবত ভারত তার দীর্ঘদিনের এজেন্ডা বাস্তবায়নে আশাতীতভাবে সফল এখানেই। "যারা ভারতের শত্রু, তারা বাংলাদেশের শত্রু"- খুবই তাতপর্যপূর্ন সমীকরণ। বলছে কে? স্বাধীন বাংলাদেশেরই একজন মন্ত্রী। মজার ব্যাপার হচ্ছে- এই সাংঘাতিক বক্তব্য দেওয়ার পরেও বাংলাদেশের কোন মিডিয়া, দেশপ্রেমিক গ্রুপ এটা নিয়ে কথা পর্যন্ত বলছে না। মানে ভারত সকল প্রেসার গ্রুপেই অবস্থান সুসংহত করে নিয়েছে। স্বাধীন বাংলার এখন অনেক তরুণই ভারতকে প্রভূ মানতে সমস্যা দেখছে না। ভাবটা এমন-"গরীব দেশ, কি আর করার আমাদের!"
গত ১৬ ই ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশের বিজয় দিবসকে নিজেদের বিজয় দিবস বলে ক্যাম্পেইন করলো। আমাদের রাষ্ট্র তো প্রতিবাদ করলোই না, একই সাথে তাবৎ মিডিয়া আর তরুণ সমাজও নিশ্চুপ। আহা! এ যেন নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ! বিজয় দিবস ছিনতাই হলেও এখন কারো চেতনায় আঘাত লাগে না। এখন সবচেয়ে বড় চেতনা "ক্ষমতা"।
সেই ক্ষমতাকেন্দ্রীক রাজনীতির সফল প্রভাবক হিসেবে ভারতকে এখন বাংলাদেশের অনেক তরুণও পূজা করতে শুরু করেছে। আমার বিশ্ববিদ্যাল্য জীবনের পাক্কা জাতীয়তাবাদী বন্ধুকেও গতকাল আমাকে বুঝানোর চেষ্টা করছে- ভারত ছাড়া আসলে কিছু হবে না। মানে জাতীয়তাবাদের সীমানা বাংলাদেশ পেড়িয়ে ভারতবর্ষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে।
আমিও একজন রাজনৈতিক কর্মী। আমার অহংকারের জায়গা হলো- এমন এক রাজনৈতিক দলের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছি, যারা হৃদয়-মন দিয়ে বাংলাদেশকে ভারতের আধিপত্যবাদ থেকে হেফাজত করতে চায়। জাতীয়তাবাদী দল বিদ্যমান থাকা অবস্থায়ও সম্ভবত বাংলাদেশের মানুষ এ দলকেই তাদের সীমানার জন্য বড় রক্ষাকবচ মনে করছে। ভারতের সেবাদাস দলের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে এক লড়াকু দল- আমার প্রিয় দল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
কিন্তু বিগত কয়েকমাসে মুদ্রার ওপিঠে একটা ভয়ংকর দৃশ্যও চোখে পড়ছে। ইদানিং কোন কোন নেতা ও কর্মী মনে করে বসছেন- ভারতের বিরোধীতা করে বাংলাদেশে রাজনীতি করা সম্ভব নয়। ভারতের সাথে আমরা নেগোশিয়েশন না করি, অন্তত বিএনপি তো করুক!
আমি খুব সাধারন এক বাংলাদেশী নাগরিক। আমি আমার দলের স্রেফ কর্মী মাত্র। জানি না কেন্দ্রীয় নীতি কি ( আশা ও বিশ্বাস করি, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, চটকদার ক্ষমতার প্রশ্নে নুয়ে পড়বে না)। যারা বিশ্বাস করতে চায়- ভারতই একমাত্র ফ্যাক্টর ( হতেও পারে), তাদের বলি- তাহলে কাজটা আরো সহজ। এই একমাত্র ফ্যাক্টরকে পরাজিত করাটাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিজয়। সূতরাং বিজয় পেতে কেবল এক ধাপ বাঁকি! ভারতের সাথে সমঝোতা করে ক্ষমতার পালাবদল হতে পারে, তবে তাতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব টিকে রাখা দায় হয়ে দাঁড়াবে। আমরা ক্ষমতার চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বকে বেশী মর্যাদা দিতে চাই। এটা শুধু ব্যক্তি হিসেবে আমারই আকাঙ্খা নয়, বরং বাংলাদেশের সহস্র দেশপ্রেমিক এমনই প্রত্যাশা করে।
আমি এই লিখাটি কেন লিখেছি- তার ব্যাখায় দিয়েই শেষ করছি। গত কিছুদিন আগে গ্রামের বাড়ি বগুড়ায় গিয়েছিলাম। সেখানে প্রায় ২০ জন শিক্ষকের সাথে মত বিনিময় অনুষ্ঠানে আমাকে ৩০ মিনিট শুধু বলতে হয়েছে- ভারতকে হিসেব করেই আমাদের সংগ্রাম করতে হবে। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমন্ডলী (যারা মনে-প্রানে ভারতবিরোধী) কিছুতেই মানতে নারাজ-ভারতকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ উৎখাত সম্ভব। আমি শেষে শুধু এতটুকু বলেছি- ধরুন আমরা ভারতের সাথে নেগোশিয়েশন এ গেলাম। তো কি কি বিষয়ে নেগোশিয়েশন হবে?