মানতেই হবে যতই অবহেলা করে ধরিনা কেন, আশাপূর্ণা দেবী এক হাত দেখিয়েই দিয়েছেন বটে। থ্রিলেরও বোধহয় অমন থ্রিল নেই, যতটা এই দেশী ঘরনার ক্লাসিকে পেলাম। এই আমি যেন মজ্জায় মজ্জায় সীমা'র আশঙ্কায় কাঁটা হয়ে থেকেছি। এবং শেষতক যে ভয়ানক দাগটা দিলেন তিনি, যেন আমারই নিজেরই কয়েক যুগের গড়া মন্দিরটা নিমেষে ধুলোয় মিলিয়ে গেলো চোখের সামনে। আর এই ধূলিসাৎ অন্য কারো দ্বারা নয়, একান্ত আপনার যে, তার-ই দ্বারা।
বলছিলাম উনার প্রথম প্রতিশ্রুতির কথা।
তারপর দিলেন সুবর্ণলতা।
যাকে বলে নিরেট ব্যর্থতা। হাড়ে হাড়ে আক্রোশ, আক্ষেপ, আর জ্বালা ধরিয়ে দেয়। সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, প্রথম বই "প্রথম প্রতিশ্রুতি" পড়বার পর দ্বিতীয় বই "সুবর্ণলতা" ভীষণ রকম অসহ্য লাগবে। সত্যবতীর মোট খাড়া মেরুদন্ড সোজা রেখে ঘোমটার মাঝেও মাথা উঁচিয়ে চলা এক রমণীর জন্ম থেকে শেষ অব্দি সঙ্গে সঙ্গে চলার পর, সুবর্ণলতার সাথে আমার এক পা'ও এগোতে ইচ্ছে করেনি স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু বোধহয় এরকমটা হবে দেখেই উনি শুরুতে বলে রেখেছিলেন, যার সারমর্ম আসে এরকম-
"সব সংগ্রাম সফল হয়না। অনেক ব্যর্থ সংগ্রামে চলার পর, একটা সফলতার মঞ্জিলের দেখা মিলে। কেউ যদি সেই ব্যর্থতার গল্প জানতে না চায়, তার অধিকার নেই সফলতার উচ্ছ্বাসে শামিল হবার।"
সেইটা উপলব্ধি করে একটা ধাক্কা খেলাম। সত্যিতো, আমরা ব্যর্থতার উপখ্যান চাই না, কেবল দুর্দান্ত সফল সংগ্রামের রোমাঞ্চ চাই। বার বার পদক্ষেপ নিয়েও হেরে, হারিয়ে যাওয়াদের গল্প আমরা চাইনা।
সুবর্ণলতা হচ্ছে, সেই মানুষগুলোর প্রতিচ্ছবি যারা খুব সাধারণ,
দুর্বিনীতা সত্যবতীর মতো রামকালী চাটুয্যে বাবা পায়নি।
পায়নি ভালোবাসার সন্ধানে, সংকোচ, ভয়, আর সমীহে মেতে থাকা স্বামী।
ছিলোনা একছত্র একান্ত একার সংসার, যেমন খুশি তেমন সাজাও।
পায়নি বন্ধুর মতো কোনো মাস্টারমশাই, যে উজাড় করে রাখে জ্ঞানের ভান্ডার।
সুবর্ণলতার এই করুন বিলাপী পরিণতির জন্য, অনেকে সত্যবতীর অবহেলাকে দায়ী করে ঘুরেফিরে। কিন্তু সত্যবতীতো তার সাধনায় কোনো কমতি রাখেনি। কিন্তু তার অর্চনার মাঝপথে কেউ বিষাক্ত আক্রোশে তা ভেঙে দিলে তার দায় কি সত্য'র উপর আদৌ বর্তায়? সবকিছু কি আর সত্য'র নিয়ন্ত্রণে চলেছে?
আর তারপর যে বকুলকথা এলো, সেখানেও আশাপূর্ণা দেবী'র অনন্য আযোজন। আদপে জেনে মনে হতে পারে-
"এ কি! এই উত্তরণ কি চেয়েছিলাম? এর জন্যই কি এতো আযোজন?"
কিন্তু আমার এখানে মনে হয়, আশাপূর্ণার উদ্দেশ্যই ছিল বুঝি এটা। তিনি বকুলকে চেয়েছেন এভাবেই। সমস্ত জাগতিক সীমাবদ্ধতার মাঝে, দৃষ্টিভঙ্গির দ্বিধায়, অন্তর্দ্বন্দ্বে, দর্শনের কলহে হারিয়ে ভেসে সাঁতরে কুল খুঁজে ফিরতে।
সত্যি বলতে বকুলকথাও সুবর্ণলতার মোট শুরুতে একঘেঁয়েমি আনবে, সত্যবতীর সে টানটান উত্তেজনা থাকবেনা, নায়কোচিত কোনো আবির্ভাব নেই, পাল্টা আঘাত হানা নেই, সম্ভাবনা নেই, আশা নেই, এক ঘোলা স্বপ্নের আড়ালে আচ্ছন্ন হয়ে থাকা কিছুই মনে হয়।
বকুল সবটা পেয়েও যেন সুবর্ণলতার মতো কূলহীন সমুদ্রে কেবল খাবিই খেলো। ঠিক বুঝে উঠতে পারলোনা, কি ভাবা উচিত, কিভাবে দেখা উচিত, কি করা উচিত!
আজন্ম অক্ষমতার ঠুঁটো দিনতায় ভুগে একটা "জবরদস্ত উচিৎ শিক্ষা" দিতে যে নবকুমার সত্যবতীর একান্ত আরাধ্যের সবেধন নীলমনিটিকে বিসর্জজনে দিয়ে কি এক পৌরুষত্ত্বের মহিমা জারি করতে চাইলো, সে যেমন সত্যবতী বোঝেনি, বুঝিনি আমিও। এটা আদিপুরুষের মজ্জাগত উত্তরসূরীর লক্ষণসুলভ বৈশিষ্ট্য বলেই পার পেয়ে যেতে চাওয়ার বাসনা? নাকি মজ্জার এই উপেক্ষার ডাক এলেও খুঁটি আগলে চটকে সেঁধিয়ে থাকবার খায়েশ?
কি গভীর শুন্যতায়, নিরাভরণ শুষ্কতায়, আর গভীর অভিমানে যেন আমিই বলে উঠলাম "মাথা পেতে সর্বংসহা হয়েও ঠাঁই না হওয়া, পুণ্যির ডালি বেঁচেও পাতকী খেতাবে উদয়াস্ত, তবুও তিলতিল করে সমস্তটা ঢেলে দিয়ে গড়ে তোলা এক আসার মন্দির, সেওতো আমারই সাত জন্মের সঙ্গিনী পায়ের তলায় গুঁড়িয়ে দিল। এ জন্মটা বুঝি বৃথাই গেলো।"
এটাই কি নিরাপদ তন্দ্রা?
কিন্তু তাই বা কিভাবে বিধানের রায়ের যুগ্যি হয়?
মেয়েরাওতো আদিনারীর কাছে থেকে আবর্তিত। অথচ কই তাদের পৰিৱৰ্তনতো অমোঘ। গঞ্জনা বঞ্ছনার পরাকাষ্ঠার শূলে দাঁড়িয়েওতো দিব্যি পৰিৱৰ্তন চাই বলে বলে হাঁক পেড়ে আসছে কালের পর কাল ধরে।
তাহলে পৃথিবীর সকল বস্তুর তুষ্টির অর্র্ঘ্য নিয়ে বসে থাকা সে পুরুষদের পরিবর্তনে এত আতঙ্ক কিসে?
নাকি নিজেদের দৈনতা আর অক্ষমতাকে ভয় পায়?
কিন্তু তাও বা কোন উচ্ছের যুক্তি?
মানুষ মাত্রেই ত্রুটি।
মেয়েজাতটাতো আর দৈব শুদ্ধির নয়।
অনেক প্রশ্ন কিন্তু উত্তর নেই কোথাও।
মানুষ, সমাজ, সংসার, এমনকি ধর্মও প্রশ্ন পছন্দ করেনা।
মেয়েছেলের প্রশ্নতো আরো না।
কেবল যা জেনে এসেছো, পালন করে যাও।
সুবর্ণলতার মতো কাটিয়ে দাও এক জীবন, তারপর শতাব্দী শেষে কোনো এক রোকেয়া কিংবা আশাপূর্ণা এলে তবেই এক ইঞ্চি জায়গার জন্য লড়তে পারো।
অন্যথা, হৈমন্তী, বিলাসী, সুবর্ণলতা, কিংবা কুমুদিনীর মতো জীবন পৃষ্ঠার পাতা উল্টানো হলেই হারিয়ে যায় অন্তরালে।
অথবা অনেককিছু করতে যেয়েও, সবটা হাতের কাছে পেয়েও একা হাতে পেরে না ওঠা দ্বিধা, দ্বন্দে, আক্ষেপ, আবেগে খাবি খেতে হারিয়ে যায় বকুলদের মতো!
All the contents are mine until it’s mentioned