মাসের দশ তারিখে হিসাবের খাতায় চোখ পড়তেই আত্মারামকে কোনোমতে খাঁচায় চেপে ধরলেও প্রবল দীর্ঘশ্বাসকে ঠেকানো যায়নি।
ভাবছি কিসের আশায় অতটা বিসর্জনের সুখ আমার!
এহেন কোনো প্রাণ নেই যে ধিক্কার করেনি। লাখ টাকার চাকরি ছেড়ে নির্দয়, বাৎসল্যহীন এই কর্পোরেট জীবনে ঢুকে যাবার এই অমূলক সিদ্ধান্তকে।
করবে নাই বা কেনো!
শতভাগ যৌক্তিক বটে!
কিন্তু সবটাতো সবাই জানেনা, জানানোও যায়না।
আবার এটাও অনায্য দাবী হবেনা যদি ব্যক্ত করি যে, সে আক্ষেপ আমারই বা কোনো অংশে কম হয়েছে!
শেষে যে চাকরিটা ছিল, সেই মাইনেতে "নগরীর বুকে একখানা চকচকে ঘর কিনতে পারতাম " বললে দুঃসাহসিকতার পরিচায়ক হবেনা, হিসাবেও এতটুকু বাহুল্য হবেনা। তবুও, কি এক তীব্র অদম্য, অবরুদ্ধ আত্মাভিমানে সে লক্ষীর মুখে সটান কপাট মেরে দিয়ে চলে এলাম ছেড়ে।
নতুন কোনো আয়-রোজগারের উপায়ান্তর না করেই, উপনয়ন হতে না হতেই পাতে ছাই দিয়ে গোসসা করে বেরিয়ে গেলাম সে ঘর আর করবোনা বলে।
কিন্তু আত্মাভিমানে বেচে কি আর পেট চলে?
চলেনি।
তা কি আমি জানতাম না?
আলবাত জানতাম! মাথা যখন আছে সেটাত খাটেই।
রাজার হালে ছিলাম বললেও অত্যুক্তি হবেনা বিন্দুমাত্র।
ধোপা এসে কাপড় কেঁচে, ইস্ত্রি করে পরিপাটি করে রেখে যায়, নিত্য স্নানের জিনিসপত্র পরিবর্তন ও পূনঃমজুত দিয়ে যায়।
আমি আপিসে বেরুলেই পরীদের মত কেউ এসে সমস্ত ঘরদোর মুছে, ময়লা ফেলে, বিছানাপত্তর পাল্টে, গুছিয়ে পরিপাটি করে তকতকে করে রেখে যায়।
হালকা কি এক ফুলেল ঘ্রাণও ছড়িয়ে যায়।
পান থেকে চুন খসবার বালাই নেই! কোনোদিন বা এর হেরফের হলে খানসামারা চিরকুট রেখে যায় সযত্নে, যেন অযথা মনস্তাত্ত্বিক বিঘ্ন না ঘটে।
ছুটি'র দিনগুলোয় মাঝেমধ্যেই আসরের আয়োজন হতো।
সমুদ্র পাড়ে কোনো এক নির্জন রেস্তোরাঁয়।
ছায়াঢাকা গাছগাছালির আড়ালে আর পাখির কলকালীতে, লোকালয়ের সকল শব্দ দূষণ থেকে দূরের সেই রেস্তোরাঁয় বসে সুবিস্তীর্ণ বালিরাশি আর সমুদ্রপৃষ্ঠে সকাল গড়ানোর সে মনোহরী দৃশ্য দেখতে দেখতে আর নিজেদের রোজ নামচা'র পঞ্চায়েতে কেটে যায় সকাল।
অতবেশী জড়িয়ে পড়া'টা ঠিক হয়ে ওঠেনা আমার। এমন না যে সে আকাঙ্ক্ষা কদাচিৎ মনের কোণে ডাক ছেড়ে ওঠেনা, কিন্তু উঠে যাওয়া আমার এ দেয়াল এত কঠিন যে আমিও পেরোতে পারিনা। সুতরাং, আমার দিনান্তপাতে অত আড়ম্বর নেই। কিন্তু আমার অই প্রশান্তির একঘেঁয়েমিতেইতো যত সুখ।
বই পড়ি, চর্চা করি, সিনেমা দেখি, ভাবি আর ভেবে ভেবে কিছু ইচ্ছে হলে টুকে রাখি, আর অপার অভিমানে "খোঁজ নাওনা" আবেদনগুলোর মাশোহারা দেবার চেষ্টা করি।
খাবার চিন্তে নেই, শোবার চিন্তে নেই, নেই পয়সাকড়ি'র ভাবনা। বন্ধু-বাৎসল্য, আসর-আড্ডা-গান, হৈহৈ রৈরৈ সবটাই ছিলো ঘটি ভরে।
এ যেনো রীতিমতো স্বর্গবাস।
আমি যে সবসময় বলি "স্বর্গ বড় একঘেঁয়ে। কোনো রোমাঞ্চ নেই, কোনো রহস্য নেই, কেবল একচেটিয়া সুখ! এ কি কারো কাম্য!?"
সুতরাং স্বভাবতই সে স্বর্গসুখ আমার সইলোনা।
রীতিমতো পরতে পরতে মেদ জমে যাচ্ছিলো, শরীরে নয়, মস্তিষ্কে, বিদ্যাতে, সর্বপরি আমার অন্ধের যষ্টি সে আত্মাতে।
ব্যস! আর যায় কোথা!
যদিও এক দেশান্তরীকে কথা দিয়েছিলাম (যেহেতু চাকরি হলো লক্ষী) "এই পণ করলেম পরদেশী, আমি আর স্বীয় চেষ্টায় লক্ষীছাড়া হবোনা!"
সে কথা রেখেছিলেম বটে!
আমিতো লক্ষীকে ছাড়িনি, সেই আমায় ছেড়ে গেলো। মনের দুষ্টবুদ্ধি খনখনিয়ে বললো, "ওরে হতচ্ছাড়া, স্বীয় হস্তে না হোক, অপরের হস্তক্ষেপেতো হতেই পারে!"
তাই হলো।
লক্ষীকান্তকে আমার আঁট ছাড়ানোর ব্যবস্থা করানো গেলো। যদিও কিঞ্চিৎ বিপাক হয়েছিল তাতে, কিন্তু বিপাকেইতো আমি পাক, সে আমার সহোদরা, নাড়ির টান। সে টান আমাকেতো টানবেই।
যাকগে ওসব বাতুলতা।
তো আমি লক্ষীছাড়া হয়ে রাজ্যপাট চুকিয়ে আমি সন্ন্যাসমনা।