পাখির কলতানে নয়, থালা-বাটির ঝনঝন শব্দে শফিকের ঘুম ভাঙলো। সরব প্রতিবাদ চলছে রান্নাঘর থেকে। এই সরব প্রতিবাদ মুহূর্তেই শব্দের ভাষা থেকে বাক্যবাণে পরিণত হল এইভাবে-
=যদি সারাদিন রান্নাবান্না আর বাসন-কোসন ধোয়াই কপালে ছিল, তবে একটা কাজের মেয়ে বিয়ে করলেই তো পারতো।😡
=আমার এই পোড়া কপাল, কোন কুক্ষণে যে বাবা মায়ের কথার অবাধ্য হয়েছিলাম! তার ফল এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।😡😡
=প্রেম করার সময় কত মিষ্টি মিষ্টি কথা- জোছনাবিলাস, বৃষ্টিস্নান, ভ্রমণবিলাস আরো কত কি!😡😡😡
=আমাকে নাকি মিশরের পিরামিড দেখাবে, ফেরাউনের ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদ আর তার বিশাল আকৃতি মূর্তি দেখাবে! চৌরাস্তার মোড় এর স্বাধীনতা মূর্তি দেখেই বিয়ের পাঁচ বছর পার করে দিলাম! ফেরাউনের মূর্তি আর মিশরের মমি তো দূরের কথা!😡😡😡😡
এই ভাববাচ্যে অথচ সফিককে ইঙ্গিত করে কথাগুলো আরো কিছুক্ষণ চলবে। রুপার এই বিনা মেঘে বজ্রপাতের কারণ শফিক জানে। বিয়ের পাঁচ বছর রূপাকে তেমন কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়নি, তাই নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে রুপাকে শান্ত করাটাই শফিকের শুক্রবারের সকালের প্রথম মিশন।
শফিক খুব সন্তর্পনে রুপাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে তার ঘন চুলে মুখ লুকিয়ে নিজেকে আত্মসমর্পণ করল। শফিক জানে রুপার এই কাজটা খুবই পছন্দ।
=এই ছাড়ো! সকাল সকাল কি করছো!
রুপার এই তীব্র অভিমান অথচ ভালোবাসা জড়ানো কথাটার অর্থ শফিক জানে। তাই সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল রুপার মনের আশাটা সে এবার পূরণ করবে।
রুপাকে এখনো বলা হয়নি সে অফিস থেকে এক মাসের ছুটি নিয়েছে। আসলে সে তার আরন্ড লীভ থেকে টাকাটা এনক্যাশ না করে সেটাকে ছুটি হিসেবে বসকে দিয়ে অ্যাপ্রুভ করিয়ে নিয়েছে। গতকালই সে তার এক মাসের জন্য সমস্ত দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে তার অধস্তন কর্মকর্তাকে। ভেবেছিল রুপাকে সকালে সে একটা সারপ্রাইজ দেবে কিন্তু সে নিজেই রুপার বাক্যবাণ এর আক্রমনের শিকার হবে তা বুঝতে পারেনি।
রুপাকে পেছন থেকে জড়িয়ে কত সময় পার হয়েছে দুজনেই হয়তো বুঝতে পারেনি। আরো হয়তো বেশ সময় পার হতো যদি না রুপার চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু কপোল গড়িয়ে শফিকের হাতকে স্পর্শ না করতো।
“আপনারা তো ভাই কনডমের পয়সা বাঁচিয়েই ঘুরতে যেতে পারেন”
পাশের ফ্লাটের ভাবীর একান্ত দুষ্টুমির ছলে নোংরা ইঙ্গিতপূর্ণ বলা কথাটা রুপার খুব লেগেছে। অনেক চেষ্টার পরও সন্তান না জন্মানোয় এবং ভ্রমণ করতে না পারার কষ্ট একত্রিত হয়ে সকালবেলা বাক্যবাণ নিক্ষিপ্ত হয়েছে শফিক কে লক্ষ্য করে। শফিকের স্পর্শে সেই পুঞ্জীভূত মেঘ এবং বজ্রপাত এখন বৃষ্টি হয়ে ঝরছে দুচোখ বেয়ে।
রুপাকে ছুটির কথা বলা মাত্রই তার চেহারায় 24 ক্যারেট গোল্ড এর একটা ঝলকানি খেলে গেল। বিকেলবেলা দুজন তাদের সেই ভ্রমণ ডায়েরিটা বের করলো যার প্রথম পাতার ছকটা এরকম-
দুই জোড়া চোখ স্বপ্ন ভরা চোখে তাকিয়ে আছে ভ্রমণ ডায়েরির এই পাতাটির দিকে। দুজনেই নিশ্চুপ হয়ে কল্পনায় অবগাহন করছে তাদের প্রিয় জায়গা গুলিতে।
রুপার সমুদ্র এবং ঐতিহাসিক স্থান দর্শনের দিকে বরাবরই বেশি ঝোঁক ছিল। তারা যখন বিয়ের কয়েক বছর পর হানিমুন করতে কক্সবাজার গিয়েছিল, দূর থেকে সমুদ্র দেখে উত্তপ্ত বালুর উপর দিয়ে রুপার সে কি দৌড়! উসাইন বোল্ট ও হয়তো সেই মুহূর্তে তার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় পরাজিত হতো!
নতুন জিনিস এক্সপ্লোর করাটা রুপার একটি নেশা। রুপা মাঝেমাঝেই আফসোস করে যে সে কেন এই শতাব্দীতে জন্মালো! এখন তো প্রায় সব জায়গাই এক্সপ্লোর করা হয়ে গেছে। সে যদি বেশ কয়েক শতাব্দী আগে জন্মাতো তাহলে হয়তো কলম্বাসের মত সমুদ্রযাত্রায় আমেরিকা অথবা মার্কোপোলোর মতো পদযাত্রায় চীনের বিভিন্ন অংশ আবিষ্কার করতে পারত।
ঐতিহাসিক স্থাপত্য দর্শন ও রুপার ভ্রমণের একটি অন্যতম লক্ষ্য। কতদিন যে সে তার স্বপ্নে মিশরের পিরামিড, মমি দেখেছে তার হিসাব নেই।তাই আমাদের বিদেশ ভ্রমণ লিস্টে মিশর প্রথমে রয়েছে।
শফিকের আবার পাহাড় খুব পছন্দ। ভ্রমণের কথা উঠলেই তার চোখে ভেসে ওঠে দার্জিলিংয়ের সেই মেঘাবৃত পাহাড়। কনকনে শীত এবং তুষারাবৃত শরীরে যেখানে মেঘ ছোঁয়া যায় দুই হাত দিয়ে! অঞ্জনের সেই কাঞ্চনজঙ্ঘা গান শোনার পর থেকে, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার ও তার খুব ইচ্ছা।
এইসব কিছু চিন্তা করতে করতে দুজনে অনেকটা সময় পার করে দিয়েছে। দুজনেই চিন্তায় এতটা মগ্ন ছিল যে কখন চায়ের কাপের অবশিষ্ট চা টুকু ঠান্ডা হয়েছে টের পায়নি।
রুপা উঠে গেল নতুন করে চা বানাতে। এই ফাঁকে শফিক আগামীকালের কাজগুলোর একটা লিস্ট করে ফেলল।রুপাকে না জানিয়েই বিয়ের পরপর সে একটা ১০০০০ টাকার ডিপিএস করেছিল। সেটা ম্যাচিওর হয়েছে। কাল সে ওই টাকাটা তুলতে যাবে।বিদেশ ভ্রমণে বেশ টাকা খরচ হবে যা সে এই টাকা থেকে যোগান দেবে।
আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে তাকে। টুরিস্ট ভিসার জন্য এপ্লাই করতে হবে বেশ কয়েকটা অ্যাম্বেসীতে।সে আশা করছে দেশের কয়েকটা জায়গা ভ্রমণ করার মাঝে তাদের এই ভিসা গুলি হয়ে যাবে। আগামী পরশু তারা রওনা হবে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে।একটি আশ্চর্যময় প্রবাল দ্বীপ যার চারদিকে সমুদ্র বেষ্টিত।
রাতের খাবার খেয়ে শফিক এবং রুপা দুজনে বিছানায় এসেছে। নভেম্বরের প্রায় শেষ এবং ডিসেম্বরের আগমনের অপেক্ষা। হালকা শীতের কারণে রুপা চাদর টেনে দিল দুজনের গায়ে। এই মুহূর্তে দুজনের চোখ বন্ধ এবং চোখের সামনে কল্পনায় দৃশ্যমান সেই ডায়রির পাতা যার মধ্যে নিহিত রয়েছে দুজনেরই অনেক অব্যক্ত সুখস্বপ্ন।
এটা আমার বিডি কমিউনিটি এর পক্ষ থেকে আয়োজিত কনটেস্টের এন্ট্রি। আপনারা যদি বিডি কমিউনিটি কর্তৃক আয়োজিত এই কনটেস্টে অংশগ্রহণ করতে চান তাহলে এই লিংকে ক্লিক করুন