প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমার এই দেশ। এই সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে চোখ যেন কিছুতেই আর জুড়াতে চায় না। এক অজানা ঘোরের মধ্যে কেটে যাচ্ছে প্রতিটিক্ষণ, প্রহর, দিন-মাস, বছর। এই ঘোর যেন কিছুতেই কাটার নয়, এক নিবিড় মমতায় জড়িয়ে রেখেছে আমাদের। এই স্নেহ, আদর-মমতা স্পর্শ করা যায় না, শুধুমাত্র অনুভব করা যায়। গর্ভধারণ না করেও বক্ষে ধারণ করে তার সমস্ত ঐশ্বর্য দিয়ে আমাদেরকে সমৃদ্ধ করেছে। এই জননীর প্রতি পরম শ্রদ্ধায় হৃদয় আজ উদ্বেলিত, কৃতজ্ঞতায় মস্তক অবনত। এই জননী আর কেউ নয় সে আমার জননী জন্মভূমি, আমার দেশ বাংলাদেশ। আজকের এই বিশেষ দিনে মাতৃভূমির প্রতি কিছুটা দায়বদ্ধতা নিয়েই এই লেখা লিখতে বসেছি।
প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ এদেশর লোকজন ভারতবর্ষের অধীনে ভালই সুখে শান্তিতে দিন যাপন করেছিল। একদল লোভী, বিভ্রান্ত এবং অপরিণামদর্শী মানুষজনের লোভ লালসা এবং ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এই দেশে ইংরেজরা প্রবেশ করতে সমর্থ হয়। পলাশীর যুদ্ধে এ দেশেরই কিছু দেশদ্রোহী মানুষের কারণে বাঙালির স্বাধীনতার শেষ সূর্য অস্তমিত হয়। সেই দেশদ্রোহিতা কারণে ইংরেজরা এই দেশে ২০০ বছর তাদের শাসন চালিয়ে যেতে সমর্থ হয়। যদিও ইংরেজরা বিভ্রান্তির মাধ্যমে এদেশে লোকজনকে বিভ্রান্ত করে ক্ষমতা দখল করতে সমর্থ হয়েছিল কিন্তু পরবর্তীতে যখন তারা ক্ষমতাসীন হয় তখন শক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা কায়েম করার মাধ্যমে এদেশের প্রশাসনকে ঢেলে সাজিয়ে ছিল। যদিও ইংরেজদেরকে এ দেশের লোকজন পছন্দ করতো না কিন্তু তাদের প্রণীত আইন দিয়ে মানুষের মনে আস্থা তৈরি করতে পেরেছিল যার ফলশ্রুতিতে তারা ২০০ বছর এদেশ শাসন করতে সমর্থ হয়।
ইংরেজরা ২০০ বছরের শাসন ব্যবস্থার শুরুর দিকে যতটা সহজ ভাবে শুরু করেছিল শেষের দিকে ঠিক তার বিপরীত ধারায় চলতে থাকে। এদেশের মানুষের প্রতি তাদের শাসন নিপিরণ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে মানুষজন বাধ্য হয় তাদের বিরুদ্ধে অনাস্থা জ্ঞাপন করতে। পুরো ভারতবর্ষে ব্যাপী ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। পরিণামে বাধ্য হয়ে ইংরেজরা এ দেশ ত্যাগ করে। তবে তারা এই ভারতবর্ষ ত্যাগের পূর্বে ধর্মের দোহাই দিয়ে এই দেশকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়ে যায়, তৈরি হয় ভারত এবং পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র। পাকিস্তান রাষ্ট্রের আবার দুটি ভাগ ছিল, পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তান। আমরা যারা আজকে বাংলাদেশের অধিবাসী তারা তখন পূর্ব পাকিস্তানের অধীনে ছিল।
বিমাতাসুলভ আচরণ যে কি জিনিস তখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমানের বাংলাদেশের অধিবাসীরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল। শিক্ষা, অর্থনীতি এমনকি মাতৃভাষা এমন কোন সেক্টর নেই যেখান থেকে তারা নিপীড়িত বা শোষিত হয়নি। বাঙালি ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে যে পশ্চিম পাকিস্তানিরা কখনোই এদেশের মানুষকে তাদের ন্যায্য অধিকার দিবে না এমন কি তারা কথা বলার অধিকার টুকু কেড়ে নিতে চায়। তাই ১৯৫২ তে মাতৃভাষায় কথা বলার দাবিতে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে এদেশে স্বাধীনতার বীজ বপিত হয়।
বাঙালি পৃথিবীর একমাত্র জাতি যারা তাদের মাতৃভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে রাজপথে এবং যা কিনা আজ ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।যদিও একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর আন্দোলন এর ফলশ্রুতিতে উর্দুকে এদেশের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে পারেনি কিন্তু এদেশের মানুষদের কখনোই তারা তাদের সমতুল্য মনে করতো না। এটি বাঙালির বুঝতে খুব বেশী দেরী হয়নি তাই তাদের মনে ধীরে ধীরে আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে যা ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান হিসেবে প্রকাশ পায়। পরবর্তীতে ১৯৭০ এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের শেখ মুজিবের নেতৃত্বে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করা সত্ত্বেও তাদেরকে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি।
নির্বাচনে জয়ী হওয়া সত্ত্বেও যখন এদেশের মানুষদেরকে তাদের ন্যায্য অধিকার এবং ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলো না তখন এদেশের মানুষের মনে একটি চাপা ক্ষোভ দেখা দেয়। শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন দল একাধিকবার পশ্চিম পাকিস্তানিদেরকে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করার ব্যাপারে জানালেও তারা তা গ্রহণ করেননি। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পরিবর্তে তারা ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ এর কাল রাত্রে এদেশের মানুষদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালায় যা কিনা অপারেশন সার্চলাইট হিসেবে পরিচিত।
১৯৭১ সালের 26 শে মার্চে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ এবং ভারতের যৌথ বাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয় এবং ২ লক্ষ নারী তাদের সম্ভ্রম হারায়। আজকে ১৬ই ডিসেম্বর এর এই দিনে এইসব মহান দেশপ্রেমিকদের প্রতি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। উপরের লেখার বিষয়বস্তু গুলো হয়তো অনেকেরই জানা কিন্তু এই লেখার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কেউ যদি একটু উপকৃত হয় তাহলে সেটাই আমার প্রাপ্তি বলে বিবেচনা করবো। ১৬ই ডিসেম্বরের আনুষ্ঠানিকতা শুধুমাত্র একটি উদযাপনের বিষয়বস্তু না হয়ে যদি দেশ গড়ার প্রত্যয়ে বলিয়ান হওয়া যায় তবেই শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে।