বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ-দলে,
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?
দুগ্ধ-স্রোতোরূপী তুমি জন্মভূমি-স্তনে।
ওপরের পঙক্তিগুলো এক অনুতপ্ত কবির হৃদয়ের রক্তক্ষরণ যা কিনা কলমের কালি হয়ে জন্ম দিয়েছে এক অনন্য এবং ঐতিহাসিক ‘কপোতাক্ষ নদ’। বাংলার সফলতম সনেট কবিতা রচনার জন্য তৎকালীন সময়ে তিনি যতটানা আলোচিত তার চেয়ে বেশি সমালোচিত ছিলেন মাতৃভূমিকে উপেক্ষা করে অন্য ভাষায় সাহিত্য রচনা করতে চাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করায়। পরে অবশ্য তিনি তার ভুল বুঝতে পেরে বাংলা সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন এবং জন্ম দেন কপোতাক্ষ নদের মত অনেক কালজয়ী কবিতা। ভূমিকাটা বোধহয় আমার অন্যতম প্রিয় কবি মাইকেল মধুসূদন এর জন্য খুব একটা মনোরম হলো না কিন্তু এটাই সত্য এবং বাস্তবতা।
জন্মভূমি আমাদের জননী। বলতে পারেন দ্বিতীয় মা। প্রথম মা আমাকে দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করেছেন আর দ্বিতীয় মা আমার গর্ভধারিনী মাকে আলো ও বায়ু দিয়ে আশ্রয় দিয়েছে তার বক্ষে। তাই আমরা সবাই দুই মায়ের কাছে আজন্ম ঋণী। জন্মভূমি বলতে আমরা অনেকেই দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থে বেশ কয়েকটি রেখা দ্বারা আবৃত একখণ্ড জমি কে বুঝি। আসলেই কি তাই? তাহলে যুগ যুগ ধরে ধারণ করা সংস্কৃতি মায়ের মুখ থেকে শেখা বুলি, এগুলো এর স্থান কোথায়? একটি জাতির রীতিনীতি কৃষ্টি-কালচার মাতৃভাষা সবিই তার জন্মভূমিকে রিপ্রেজেন্ট করে।
বাঙালি এবং বাংলাদেশি হিসেবে আমি গর্ববোধ করি। বাঙালি কথাটা আমি সচেতনভাবেই যুক্ত করেছি কারণ বাংলাদেশী হিসেবে আমাদের আবির্ভাব ১৯৭১ এ আর বাঙালি হিসেবে আত্মত্যাগ ও স্বীকৃতি ১৯৫২ সালে। আমরাই একমাত্র জাতি যারা মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল রাজপথে। অনেক যুগ পরে হলেও মহান ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগ আজ ইউনেস্কো দ্বারা স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মুখরিত হয় শিশু কিশোর এবং বয়স্কদের প্রভাতফেরীর মিছিলে। নগ্নপায়ে সবার হাতে একগুচ্ছ ফুল আর কন্ঠে সেই কালজয়ী গান-
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
১৯৫২ এর একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির জন্য এক ধরনের জাগরণের ডাক ছিল। বাঙালি অনুধাবন করতে পেরেছিল তার ভেতরের সুপ্ত আগ্নেয়গিরিকে যার ফলশ্রুতিতে একে একে আসে ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন যাতে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে।
এরপর এলো সেই ভয়াল ২৫ শে মার্চের কালরাত্রি যাকে কিনা অপারেশন সার্চলাইট হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছিল। এই রাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সশস্ত্র পাকহানাদার বাহিনী। এই এক রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে শুরু করে অলিতে-গলিতে পড়ে থাকতে দেখা যায় হাজারো লাশ। ২৬ শে মার্চ বাঙালি জাতিকে উদ্বুদ্ধ দানকারী প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন তবে তিনি গ্রেফতারের আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্বলিত একটি লিখিত বক্তব্য রেখে যান যা কিনা পরবর্তীতে ২৭ মার্চ তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে ঘোষণা করেন।
এরপর ৯ মাসব্যাপী চলে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ যাতে কিনা ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হন এবং ২ লক্ষ মা বোন তাদের সম্ভ্রম হারান। সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ও ট্রেনিং দিয়ে সব ধরনের সহায়তা করেছিল। তবে ডিসেম্বরের শুরুর দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে একত্রিত হয়ে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় যা কিনা মিত্রবাহিনী নামে পরিচিত। উপর্যপুরি আক্রমণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ৯৩০০০ সৈন্য সহ মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং অভ্যুত্থান ঘটে লাল সবুজের পতাকা সমৃদ্ধ একটি রাষ্ট্রের যার নাম বাংলাদেশ।
আমরা সবাই ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ এই সময়কালের সকল শহীদদের কাছে আজন্ম ঋণী। তাদের আত্মত্যাগেই আজ আমরা মাতৃভাষায় কথা বলি এবং স্বাধীন একটি রাষ্ট্রে বসবাস করি। বিশ্বের যেকোন প্রান্তে থাকি না কেন আমি আমার দেশকে নিয়ে গর্ববোধ করি। এর ব্যতিক্রম ও অবশ্য রয়েছে, একশ্রেণীর অর্বাচীন মানুষ রয়েছে যারা ভিন দেশে গিয়ে জন্মভূমিকে অবজ্ঞা করে এবং বাঙালি হিসেবে পরিচয় দিতে দ্বিধাবোধ করে। এই জ্ঞানপাপীদের জানা উচিত মাতৃভূমিকে উপেক্ষা করা মানে হচ্ছে নিজের মাকে অস্বীকার করা। আমার বিশ্বাস এই দলভুক্ত মানুষ মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো একদিন অনুশোচনায় দগ্ধ হবে এবং তখন হয়তো অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। কোন এক বিষণ্ণ বিকেলে, বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরে, হাজারো অচেনা মুখের ভিড়ে, খুঁজে ফিরবে একটি প্রিয় মুখ এবং তার বক্ষ দিয়ে প্রবাহিত সেই স্রোতস্বিনী নদী যার মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে কেটেছে তার দুরন্ত কৈশোর।
দেশ নিয়ে আমার নিজের আরো কয়েকটি লেখা রয়েছে যার মধ্যে নিচে লেখা টি অন্যতমলিংক
এই পোস্টে ব্যবহৃত সবগুলো ছবি আমার নিজের এবং আমার আইফোন দিয়ে তোলা।
ধন্যবাদ।
সবাই ভাল থাকবেন।