overloading

Words
767
Reading
4 min
Listen
Play
9y

ওভারলোডিংয়ের সমাধান আপাতত তিনটি--হয় ওভারলোডিং হতে না দেয়া (ওয়ে স্টেশন বসিয়ে এবং সাথে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্যে), নয়তো ট্রাকের অ্যাক্সেল বাড়ানো, নয়তো বেশি লোডের জন্য রাস্তা ডিজাইন করা। ওভারলোডিং নিয়ন্ত্রণে বড় সমস্যাটাও রাজনৈতিক। পরিবহণ মালিক-শ্রমিক ইউনিয়নের পাণ্ডা কারা, সেটা সবাই জানি, তাই আমি ভাশুরের নাম মুখে নিলাম না। তবে এটা সবাই জানি যে, ওভারলোডিংয়ের দায়ে ক'টা ট্রাক আটকালেই হাইওয়েতে হরতাল শুরু হয়ে যাবে। যেহেতু প্রতিটি শ্রমিক একটি ভোট, কাজেই এই ঝুঁকি কে নেবে? তাছাড়া, সড়ক বিভাগের হাতে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নেই, কাজেই পুলিশ-প্রশাসনের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া এটা অসম্ভব। পুলিশ-প্রশাসনেরও কাজের কমতি নেই, কাজেই এই কাজের জন্য আলাদা বাহিনী গঠন করা না হলে, এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক ইউনিয়নের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হলে তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবে এটা সম্ভব না। বেশি লোডের ট্রাকে অ্যাক্সেল সংখ্যা বাড়ানোটাও আইন করা ও তার প্রয়োগ করা না হলে সম্ভব নয়। এঞ্জিনিয়ারিং সমাধান হলো বেশি লোডের জন্য রাস্তা ডিজাইন করা। এটা খুবই সম্ভব, যদি যথেষ্ট পরিমাণ বাজেট পাওয়া যায়, এবং যথেষ্ট মানে অনেক বেশি। সবাই বলবেন, বাংলাদেশের রাস্তা নাকি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল রাস্তা, তা-ও হয় না, নিশ্চয়ই সব চুরি করে ফেলে। বিশ্বাস করুন, ৫০-৬০ টন লোডের জন্য ডিজাইন করতে যে টাকা লাগবে, ঐ টাকা দিলে রোড সেক্টরেই সব টাকা দিয়ে দিতে হবে, আর কোথাও কিছু দেয়া লাগবে না। রিজিড, বা কংক্রিট পেভমেন্ট একটা সমাধান হতে পারে, কিন্তু সেটাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

images.jpeg

তারপরেও, বৃষ্টিপ্রধান দেশে কংক্রিট পেভমেন্ট ভাল কাজ করে বলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এর মাঝেই দেশের অনেকগুলো বাজার এলাকা, এবং কিছু মহাসড়কেও এই পেভমেন্ট বানানো শুরু করেছে। কিন্তু তারপরেও, নির্মাণ ব্যয় খুবই বেশি। আর যদি আপনি ৫০ টনের জন্য রাস্টা বানান, এরপরে ট্রাকগুলো ১০০ টন নিয়ে যাতায়াত শুরু করবে। কারণ চাহিদার কোন শেষ নেই। শামসুল হক স্যারের ক্লাস থেকেই একটা কথা কোট করি--"ডিমান্ড কন্ট্রোল করো, কারণ সাপ্লাই দিয়ে কখনোই কুলাতে পারবে না, মানুষের চাহিদার লাগাম ছেড়ে দিলে সেটা বাড়তেই থাকে।"
মহাসড়কে আরেক সমস্যা হলো ড্রেইনেজ। আমাদের দেশের প্রায় সব মহাসড়ক হলো বিটুমিনাস পেভমেন্ট, আর এর যম হলো জমে থাকা পানি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলি। বেশিরভাগ রাস্তার পাশের ড্রেইনগুলো লোকজন আবর্জনা আর মাটি ফেলে ভরাট করে ফেলে কয়েকদিন পরপরই। যতই পরিস্কার করা হোক, নিষেধ করা হোক, কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। এর বিরুদ্ধে সেরকম কোন আইনও নেই। আবার মহাসড়কের পানি নেমে যাওয়ার জন্য কিনারার দিকে রাস্তা ঢালু করা থাকে, সেখানে আবার লোকজন কিনারায় বাঁধের মত মাটি উঁচু করে রাখে যাতে রাস্তার পানি তার জমির দিকে না যায়। বাজার বা শহর এলাকায় তো কথাই নেই, ড্রেনের ওপরই দোকানপাট তুলে ফেলে। ফলাফল জলাবদ্ধতা, এবং রাস্তা ধ্বংস। আবার সামান্য ধুলা ওড়া ঠেকাতে লোকজন নিয়মিত তার দোকান বা বাসার সামনে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখে, তার উপর দিয়ে কিছুদিন ভারি যানবাহন গেলেই রাস্তা শেষ।
এবার রাস্তার মেইনটেন্যান্স। শামসুল হক স্যার কোথা থেকে "আমেরিকার ১৫-২০ বছর"-এর থিওরি আনলেন, আগি জানি না; কারণ তিনি নিজে আমাদের ক্লাসে এমন উদ্ভট কিছু পড়াননি। বরং রাস্তা বানানোর থিওরিই হলো, ডিজাইন লাইফ পর্যন্ত রাস্তা টিকিয়ে রাখতে হলে রুটিন মেইনটেন্যান্স (যেটা নিয়মিত করতে হবে) এবং পিরিয়ডিক মেইনটেন্যান্স (কিছুদিন পর পর) করতে হবে। রাস্তা বানানো হয় 'ফ্যাটিগ লোডিং' এর জন্য, অর্থাৎ ক্রমাগত যানবাহনের লোড যাওয়ার ফলে রাস্তার ভারবহন ক্ষমতা কমবে ও ক্ষয় হবে, সেজন্য নিয়মিত মেইনটেন্যান্সের কোন বিকল্প নেই। আমেরিকা, শ্রীলঙ্কা আর নেদারল্যান্ডে গেছি, ইংল্যান্ড আর জাপানে ছিলাম বেশ লম্বা একটা সময়, কিন্তু স্যারের এই গায়েবি 'নো মেইনটেন্যান্স' রাস্তা দেখার সৌভাগ্য এই অধমের হয়নি কোন দেশেই।
নির্মাণ ব্যয় নিয়ে তেমন কিছু বলতে চাই না, এখানে প্রকৌশলী ও রাজনীতিবিদদের নানারকম তুঘলকি কাণ্ডকে অস্বীকার করা যায় না। সেসব অভিযোগ মেনে নিয়েই বলছি, ইনডিয়া বা আমেরিকা বা কানাডা-অস্ট্রেল
িয়ার সাথে বাংলাদেশের নির্মাণ ব্যয় তুলনা করা যায় না। মূল কারণ হলো আমাদের দেশে পাথরের অপ্রাপ্যতা। পাথরের জন্য আমরা প্রায় পুরোটা ''বন্ধুরাষ্ট্রের' দয়ার উপর নির্ভরশীল, সিমেন্টের কাঁচামালের জন্যও তাই। মনোপলি ব্যবসা বলে যখন-তখন পাথরের দাম লাফ দিয়ে বাড়িয়ে দেয়া হয়, এবং আজকাল সেটা কমেও না। কাজেই শুধু রাস্তা নয়, যেকোন নির্মাণ কাজে বাংলাদেশে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বাংলাদেশের আবহাওয়া আর মাটিও রাস্তা নির্মাণের ও টিকে থাকার জন্য অনুকুল নয়, কাজেই ব্যয় বাড়ছে। আরেকটা কারণ হলো আমাদের অর্থবছর। এখানে অর্থ ছাড় হয় তিন কিস্তিতে, আর শেষ কিস্তির ছাড় যখন আসে, তখন বর্ষাকাল আগতপ্রায়, যখন কাজ করা মানেই অর্থের অপচয়। অর্থবছরটাকে ৩ মাস এগিয়ে আনলে শুধু রাস্তা নয়, অন্যান্য নির্মাণকাজেও কার্যকারিতা বেড়ে যাবে অনেকগুণ।
শেষ করতে চাই শুধু একটা কথা বলে--অন্তত আমি রাস্তা ভাল রাখতে না পারার জন্য প্রকৌশলীদের ব্যর্থতা স্বীকার করি। এই ব্যর্থতার মাঝে একটা বড় ব্যর্থতা হলো গত ৪৫ বছরেও আমাদের দেশের আবহাওয়া, মাটি ও ট্রাফিক অনুযায়ী রাস্তা বানানোর উপযুক্ত সমাধান আবিষ্কার করতে না পারা। এই দায় শুধু চাকরিরত প্রকৌশলী নয়, বরং যারা একাডেমিয়াতে কাজ করেন, মানে বিশ্বদ্যালয়ের শিক্ষককুল এবং গবেষকদের উপরও বর্তায় একদম আমাদের মতই। এর সমাধানও শুধু সড়ক ও জনপথ বা এলজিইডি বা সেনাবাহিনীর হাতে নয়। সমাধান হতে হবে রাজনৈতিক, সমাধান হতে হবে জনগণের সচেতনতা থেকে, সমাধান হতে হবে একাডেমিয়া থেকেও। ব্লেইম গেইম খেলার বদলে, দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা চেষ্টা করছি, আমাদের সাহায্য করুন।

overloading | Ecency