হাতি ছুঁড়ে মারা
বাঘ মারাবার পর থেকে দিকে দিকে মগা পালোয়ানের বীরত্বের কথা ছড়িয়ে পড়ল।
একান সেকান থেকে কথাটা একসময় রাজার কানে পৌঁছাতে দেরি হল না।
রাজা তার রাজ্যে এমন বাঘ মারা পালোয়ান আছে সেটা যেন বিশ্বাসই করতে পারলেননা। হুকুম দিলেন ব্যাটাকে তাড়াতাড়ি খুঁজে নিয়ে আসার জন্য। কেমন পালোয়ান হয়েছে ব্যাটাকে একটু পরিক্ষা করতে হবে।
রাজার তলব বলে কথা, সাথে সাথেই প্রহরীরা ছুটল সাতাইশা পালোয়ানকে খুঁজে আনতে।
এদিকে সবে মগার জীবনে একটু সুখ শান্তি সেখা দিয়েছে। পালোয়ান বলে কথা। লোকেরা এখন তাকে ভয় ভক্তি করে। উপহার দেয়। তাই সেই আলস দুপুরে ভরপেট খেয়ে দেয়ে মগা উঠোনেই শুয়ে নাক ডাকতে থাকে। এমন সময় দরজায় কারা যেন হাঁক দেয়;
সাতাইশা পালোয়ান বাড়ি আছো নাকি?
মগা কাঁচা ঘুম থেকে উঠে রাজার পেয়াদা দেখে একদম ভড়কে গেল। কোনমতে ঢোক গিলে সে বলল, এইত আছি ভাই, কি খবর বল?
পেয়াদারা যা বলল তাতে ভয়ে মগার আত্মারাম খাঁচাছাড়া হতে চলল। সে ভাবল এই বুঝি তার সব জারিজুরি ফাস হয়ে যায়। রাজা যে কি জন্য তাকে এমনভাবে তলব করল তা সে ভেবে পেল না।
যাই হোক পরদিন সকালে সাতাইশা পালোয়ান বউএর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলল রাজবাড়ীর দিকে। কতকিছুই সে ভাবল মনে মনে কিন্তু কিছুতেই কিছু মেলাতে পারল না।
রাজদরবারে বেশ সক্কাল সক্কালেই হাজির হল মগা। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজামশাই রাজদরবারে এলেন। পালোয়ান মগাকে দেখে তিনি তো হেসেই খুন। এই পেটমোটা সাধাসিধা লোকটা নাকি পালোয়ান, এবং সে বাঘও নাকি মেরেছে। রাজা নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারলেন না।
রাজা হুকুম জারি করলেন; এই পালোয়ান বহু বাহাদুরি দেখিয়েছে। কিন্তু আমি বা আমার সভাসদরা কেউ নিজের চোখে তার আশ্চর্য ক্ষমতা দেখিনি। তাই কাল প্রত্যুষে সাতাইশা পালোয়ান একটা হাতিকে লেজ ধরে ছুড়ে মারবে। আশা করি পালোয়ানের এতে তেমন কোন সমস্যা হবে না। হা হা!!
আর যদি সাতাইশা পালোয়ান হাতিকে ছুড়ে মারতে না পারে তাহলে তার গর্দান যাবে।
আজ সারা রাজ্যে ঢেঁড়া পিটিয়ে জানিয়ে দাও রাজার এই আদেশ। সাথে সাথে আদেশ তামিলের জন্য লোকেরা কাজে লেগে গেল।
এদিকে বিকেলে রাজসভা থেকে ফিরে ভয়ের চোটে মগার জ্বর এসে গেল। বউএর কাছে সে কেঁদে উঠল; কাল তার কপালে কি ঘটতে চলেছে? এবার রাজার জল্লাদের তরবারি তার ধড় থেকে মাথাটাই না আলাদা করে ফেলে।
বউ তাকে অনেক শান্তনা দিল। বলল, কাল যা হয় দেখা যাবে তুমি এখান থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারবে না।
কি আর করা। পরদিন সকালে মগা তার বউ এর সাথে রাজবাড়িতে গেল। লোকে লোকারণ্য অবস্থা। রাজ্যের সব লোক পালোয়ানের হাতি ছোঁড়া দেখতে এসেছে।
মগা আস্তে আস্তে রাজার কাছে গেল। রাজা মগার অবস্থা দেখে তো আরো মজা পেলেন। পালোয়ানের অবস্থা এক রাতের চিন্তায় একেবারে কাহিল হয়ে গ্যাছে।
রাজা হুকুম দিলেন, পালোয়ানকে এখনি মঞ্চে হাতির কাছে নিয়ে যাওয়া হোক।
পেয়াদা এসে মগাকে মঞ্চের কাছে নিয়ে গেল। মগা দেখল মঞ্চে বিশাল এক হাতির ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাতিটা যেন পিট পিট করে কয়েকবার মগাকে দেখে নিল। লোকের চিৎকার আর কোলাহলে মগার মাথাটা কেমন যেন বোঁ বোঁ করতে লাগল।
কিন্তু রাজার আদেশ বলে কথা। আস্তে আস্তে মগা হাতিটার কাছে গেল। হাতিটাও কেমন যেন চুপ করে আছে। কোন উচ্চবাচ্য করছে না। এবার মগা আস্তে আস্তে হাতিটার লেজে হাত দিল। আশ্চর্য ব্যপার হাতিটা তবুও কিছু বলল না। নট নড়ন চড়ন।
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মগা চোখ বন্ধ করে হাতিটাকে লেজ ধরে শুন্যে তুলে কয়েক পাক ঘুরিয়ে ছুঁড়ে দিল। উপস্থিত লোকেরা আর রাজা অবাক বিশ্ময়ে দেখলেন হাতি আকাশে উড়তে উড়তে একসময় দৃষ্টির বাইরে চলে গেল।
লোকেরা কিছুক্ষনের জন্য একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। তারা নিজের চোখের সামনে এমন ঘটনা জীবনে দেখেনি। আর ভবিষ্যতেও দেখবে বলে মনে হয় না। তারা একসাথে সাতাইশা পালোয়ানের জন্য জয়ধ্বনি করতে লাগল।
এদিকে মগার তো আরো খারাপ অবস্থা। সে কিভাবে এত ওজনের একটা হাতিকে শুন্যে ছুড়ে দিল তা বুঝে উঠতে পারল না। হওসাবটাও যেন মিলছে না। কিছু লোক এসে ইতিমধ্যে তাকে কাঁধে তুলে নিয়েছে আর চিৎকার করছে।
রাজা তো মহাখুশি। হাজার হাজার সোনার মোহর তিনি পালোয়ানকে উপহার দিলেন। আর মগাকে রাজবাড়ীতেই থাকবার হুকুম জারি করলেন।
মগা যেন নিজে নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারল না। যাই হোক এভাবেই মগা পালোয়ানের জীবনে শুরু হল আরেক অধ্যায়।
চলবে......
[Inspired by a poem of the great bengali writer and poet Sukumar Roy]