ভিনগ্রহ জয়ের আশা মানবজাতির আজন্ম স্বপ্ন। রোবট এর মাধ্যমে মহাকাশ গবেষণার কাজ শুরু হয়েছে আরো বেশ কয়েক বছর আগে। সাম্প্রতিক সময়ে মনুষ্যবিহীন মহাকাশযানগুলো সেই গবেষণাকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতে প্রস্তুত। এসব অভিযান অদূর ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানব বসতি গড়ে তোলার ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা সাম্প্রতিক সময়ে মঙ্গল গ্রহে প্রেরণ করেছে পারসিভিয়ারেন্স নামের এক মঙ্গল যান। মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এর চেয়ে উন্নত রোবট অতীতে কোথাও পাঠানো হয়নি। মঙ্গল গ্রহ জয়ের যাত্রায় নাসা মোটেও একা নয় এই প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছে চীন ও আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো। গত কয়েক বছরে চীন ও আরব আমিরাত মঙ্গলগ্রহ অভিযানের জন্য রকেট পাঠিয়েছে। আর এই সকল রকেটগুলো 2021 সালের ফেব্রুয়ারীতে মঙ্গল গ্রহে অবতর করেছে।
পৃথিবী থেকে মঙ্গল গ্রহের দূরত্ব এবং যাত্রার উদ্দেশ্য
পৃথিবী থেকে মঙ্গল গ্রহে যেতে একটি মহাকাশযানকে পাড়ি দিতে হয় প্রায় 50 কোটি কিলোমিটার।এই দূরত্ব অতিক্রম করতে সময় লাগে প্রায় সাত মাস। পৃথিবীর অভিকর্ষ বল ছাড়িয়ে বিশাল দূরত্বের এই পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য রকেট গুলোকে শুরুতেই প্রতি ঘন্টায় 34 হাজার কিলোমিটার গতিবেগ অর্জন করতে হয়। অর্থাৎ এই গতি প্রতি সেকেন্ডে অতিক্রম করে সাড়ে 500 কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব। এতে অবাক হবার কিছুই নেই কারণ মহাকাশে যাবার পর রকেটের গতিবেগ দাঁড়ায় 1 লক্ষ 21 হাজার কিলোমিটার প্রতি ঘন্টায়। অর্থাৎ রকেট তখন প্রতি সেকেন্ডে 2000 কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে। ভিনগ্রহে মহাকাশ অভিযান পরিচালনার মূল অনুপ্রেরণা হলো সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কিনা তা অনুসন্ধান করা। এত বড় সৃষ্টিজগতে শুধু আমাদের গ্রহ পৃথিবীতে কি প্রাণী বসবাস করে নাকি অতীতে অন্যান্য গ্রহও ছিল প্রাণবন্ত। সেই কৌতূহল মেটানোর বুনিয়াদি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে মঙ্গলের মাটিতে। অতীতে পানির উৎস, রাসায়নিক আলামত, আবহাওয়া ও জলবায়ু, ভূমি গঠন, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ সহ নানান বিষয়কে সামনে রেখে মঙ্গল গ্রহের গবেষণা চলছে।
মঙ্গল গ্রহে যাত্রার সময়কাল
পৃথিবীর চারপাশে স্যাটেলাইট অনেকেই পাঠিয়েছে। এমনকি চাঁদে যাওয়াটাও এখন আর তেমন আকর্ষণীয় নয়। তাই সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতে হলে জয় করতে হবে অন্য কোন গ্রহ। আর এই লাল গ্রহ হল নতুন মহাকাশ দৌড়ের প্রধান গন্তব্য। তবে ঠিক একই মুহূর্তে একাধিক দেশের মঙ্গল অভিযানের পেছনে আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। পৃথিবী এবং মঙ্গল ভিন্ন ভিন্ন দূরত্ব এবং গতিতে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। তাই গ্রহ দুটি সব সময় পাশাপাশি থাকে না। মঙ্গল আর পৃথিবীর সর্বোচ্চ দূরত্ব প্রায় 40 কোটি 10 লক্ষ কিলোমিটার ও সর্বনিম্ন দূরত্ব প্রায় 6 কোটি কিলোমিটার। সর্বোচ্চ দূরত্বের সময় যাত্রা শুরু করলে মঙ্গলে পৌঁছাতে লাগবে কয়েক বছর। অন্যদিকে প্রতি 26 মাস পর পর পৃথিবী ও মঙ্গল একে অপরের খুব কাছে চলে আসে। সেই সর্বনিম্ন দূরত্ব অতিক্রম করতে সময় লাগে মাত্র 7 মাস। তাই এই সময় সবচেয়ে বেশী মহাকাশ যান মঙ্গলে প্রেরন করা হয়।
মহাকাশযানের যাত্রা এবং অবতরণ
পৃথিবী থেকে রকেট পাঠানোর সাথে সাথে তা মঙ্গলের দিকে যাত্রা করে না। প্রথমে পৃথিবীর মহাকর্ষ বল অতিক্রম করে রকেট পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে থাকে। এরপর সময়-সুযোগমতো নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে রকেট এর ইঞ্জিন চালু করে মঙ্গলের দিকে ধাবিত হয়। এই ধরনের গতিপথকে বলা হয় হোম অ্যান্ড ট্রানস্ফার অরবিট। এর উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীর মহাকর্ষ অতিক্রম করে মঙ্গলের মহাকর্ষ বলের ভেতরে ঢুকে যাওয়া। তবে এই সময় পৃথিবীর বলয় অতিক্রম করা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ যাত্রা শুরু করতে হবে এমন একটা দিকে যেখানে মঙ্গল এই মুহূর্তে নেই। কিন্তু 7 মাস পর মঙ্গল গ্রহ সেখানে থাকবে। দ্বিতীয় ধাপের যাত্রা যদি ঠিকমতো শুরু না হয় তাহলে এই দীর্ঘ সফর পুরোটাই ব্যর্থ হবে। এছাড়া মহাকাশযান থেকে রকেট গ্রহে অবতরণের সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। এটি মঙ্গল অভিযানের সবচেয়ে বিপদজনক ধাপ। গ্রহটির জলবায়ু ভেদ করে প্রতি ঘণ্টায় সাড়ে 19 হাজার কিলোমিটার গতিবেগে মঙ্গলের মাটিতে অবতরণ করতে হবে। আর এই সময় যন্ত্রটির সাথে সকল ধরনের যোগাযোগ বন্ধ থাকবে। পৃথিবী থেকে মঙ্গল গ্রহে যোগাযোগ করতে প্রায় 10 মিনিট সময় লাগে। তাই ঐ সময়ের মধ্যে কি ঘটছে তা জানার সুযোগও নেই। সেজন্য মঙ্গলের রোবট অবতরণের জন্য সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে।
নাসার মহাকাশযান পারসিভিয়ারেন্স এবং ইনজিনিউয়িটি
নাসার পারসিভিয়ারেন্স একটি গাড়ির সমান। এটি চালিত হবে পারমাণবিক শক্তির সাহায্যে। এতে যুক্ত আছে 19 টি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ক্যামেরা। এইসব ক্যামেরা দিয়ে অত্যন্ত নিখুত ত্রিমাত্রিক ছবি তোলা যাবে। এই রোবটের সাহায্যে মঙ্গলের মাটি খনন করে সেই নমুনা সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে। যা পরবর্তীতে মঙ্গল অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি হতে যাচ্ছে পৃথিবীতে আসা মঙ্গলের প্রথম কোন নমুনআ। এছাড়া এই অভিযানের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট হলো একটি হেলিকপ্টার এর নাম দেওয়া হয়েছে ইনজিনিউয়িটি। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো অন্য কোনো গ্রহে নিয়ন্ত্রিত উড্ডয়নের পরীক্ষা চালানো হবে। এসবের উদ্দেশ্য হলো মঙ্গলের ভূমিরূপ ও জলবায়ুকে গভীরভাবে অনুধাবন করা। মঙ্গলের জলবায়ু কীভাবে পরিবর্তিত হয় এগুলো জানা। এগুলো বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে অতীতে কোন অনুজীব এখানে ছিল কিনা অথবা গ্রহটি মানব বসতির জন্য উপযোগী কিনা?
এই মুহূর্তের অভিযানগুলো সফল হলে হয়তো জানা যাবে মানব সমাজের বহু কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের উত্তর।