হাবল টেলিস্কোপ এর উত্তরসূরি হলেও বর্তমান জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ হাবল এর চেয়ে 100 গুণ বেশি শক্তিশালী। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ নাসার দ্বিতীয় পরিচালক জেমস ই. ওয়েব এর নামে নামকরণ করা হয়েছে। তিনি অ্যাপোলো অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যে অভিযানের মাধ্যমে মানুষ চাঁদের বুকে পা রাখতে পেরেছিল। ইউরোপ ,আমেরিকা এবং কানাডার মহাকাশ গবেষণা সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অতিসংবেদনশীল এই যন্ত্রটি নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া 14 টি দেশের 300 টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থা এবং কম্পানি এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছে। আরিয়ান ফাইভ রকেটের মাধ্যমে ফরাসি গায়ানার মহাকাশ স্টেশন থেকে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। টেলিস্কোপটি পৃথিবী থেকে 15 লক্ষ কিলোমিটার দূরের কক্ষপথের স্থাপিত হবে। পৃথিবী থেকে এত দূরে মহাকাশের তাপমাত্রা -233 ডিগ্রী সেলসিয়াস।এই অতি শীতল তাপমাত্রা ছবি তোলার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ প্রদান করবেন। পৃথিবী থেকে এত দূরে পাঠানোর প্রধান উদ্দেশ্য হলো টেলিস্কোপ এর যন্ত্রপাতি ঠান্ডা রাখা ।পৃথিবীর কাছ দিয়ে দূরবীক্ষণ পরিভ্রমণ করলে পৃথিবী থেকে প্রতিফলিত উত্তাপের কারণে এর যন্ত্রপাতি গরম হয়ে যেতে পারে। যার ফলে যন্ত্রটির নিখুঁত পরিমাপে সমস্যা দেখা দিবে। মহাবিশ্বের বহুদূরের বিষয় পর্যবেক্ষণ করার জন্য এই দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করা হবে। বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের সৃষ্টির সময় ছড়িয়ে পড়া আলো সংগ্রহ করে ছবি তুলবে জেমসের টেলিস্কোপ এই মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র শুধু অতীতের সন্ধানী করবেনা অতীতকে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরবে। সে কারণে একে বলা হচ্ছে টাইম মেশিন। জেমস এর প্রধান দুটি বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য হলো ছায়াপথের জন্ম ও বিবর্তন এবং গ্রহসমূহের সৃষ্টিরহস্য পর্যবেক্ষণ করা। এসব তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হলে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও বিশ্বতত্ত্বের অসংখ্য গবেষণার দ্বার উন্মোচিত হবে। মহাবিশ্বের সবচেয়ে দূরে কি আছে এবং সেখানে কি ঘটছে তা দেখার চেষ্টা করা হবে এই টেলিস্কোপ এর সাহায্য। আরেকটি লক্ষ্য হলো বহু দূরের গ্রহ গুলোর পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করা যার মাধ্যমে অনুমান করা সম্ভব হবে সেগুলোতে কোন প্রাণীর বসবাসের মতো পরিবেশ আছে কিনা।
জেমস ওয়েবের অবস্থান নির্ধারণ
আমাদের সোলার সিস্টেমে পৃথিবীর সাপেক্ষে পাঁচটি ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট রয়েছে।এই ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট এর একটি চমৎকার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আপনারা খেয়াল করলে দেখবেন সূর্যের কাছের গ্রহ সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে যে সময় নেয় দূরের গ্রহ তার চেয়ে বেশি সময় নেই। এখন জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ যেহেতু পৃথিবী থেকে 15 লক্ষ কিলোমিটার দূরে স্থাপন করা হবে । ফলে পৃথিবী এবং জেমস ওয়েব সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন সময় নিবে, যদি এমনটা হয় তবে সময়ের সাথে সাথে পৃথিবী এবং জেমস এর মধ্যবর্তী দূরত্ব অনেক বেড়ে যাবে। যার ফলে জেমস ওয়েবের কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরি হবে। এমন সমস্যার ক্ষেত্রে সমাধান হচ্ছে ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট।এই ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট গুলো গ্র্যাভিটেশনালি স্ট্যাবল অর্থাৎ এই পয়েন্টগুলোতে কোন বস্তু স্থাপন করলে এরা পৃথিবীর সাপেক্ষে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখবে। সহজ করে বললে পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে যে সময় নেয় ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্টে কোন বস্তু রাখলে তা সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে একই সময় নেবে। সুতরাং পৃথিবীর সাপেক্ষে ঐ বস্তুর দূরত্ব একই থাকবে। এই পাঁচটি ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্টের মধ্যে সবচেয়ে পারফেক্ট হচ্ছে L2 ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট।এই পয়েন্টের কারনে ক্ষেত্রে সূর্যের আলো পৃথিবীর কারণে আটকে যাবে জেমস ওয়েব ঠান্ডা থাকবে।
আয়না
হাবল টেলিস্কোপে সরাসরি কাচের আয়না ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু জেমস ওয়েব এর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে স্বর্ণ। কারণ কাচের আয়না ভিজিবল লাইট এবং আল্ট্রাভায়োলেট লাইট খুব ভালো প্রতিফলিত করতে পারে। কিন্তু জেমস ওয়েব মূলত কাজ করবে ইনফ্রারেড রে নিয়ে এবং ইনফ্রারেড লাইট সবচেয়ে ভালো প্রতিফলিত হয় স্বর্ণের মধ্যে। জেমস ওয়েব এর প্রাইমারি মিরর হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে 1.32 মিটার কর্ণ বিশিষ্ট 18 টি ষড়ভুজাকৃতির বেরিলিয়াম কাঠামো। বেরিলিয়াম ব্যবহারের কারণ হচ্ছে ওজনে হালকা সেইসাথে নিম্ন তাপমাত্রা এবং উচ্চ তাপমাত্রায় নিজ আকার ধরে রাখতে পারে। বেরিলিয়াম এই 18 টি কাঠামোর উপর স্বর্ণের প্রলেপ দেয়া হয়েছে। এবং সেই স্বর্ণের প্রলেপ খুবই পাতলা ছিল। এই আঠারোটি বিশাল কাঠামোতে স্বর্ণের প্রলেপ দিতে ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র 48 দশমিক 2 গ্রাম স্বর্ণ। এখানে একটি বিষয় বলা দরকার এই 18 টি আয়না কিন্তু প্রোগ্রামেবল এই 18 টি খণ্ড আলাদা আলাদাভাবে নাড়াচাড়া করা সম্ভব এর ফলে সুবিধা হচ্ছে প্রাইমারি মিররের আলো যদি সেকেন্ডারি মিররের ঠিকভাবে ফোকাস না করে তবে যেন প্রাইমারি মিরর গুলো ঠিকঠাক ভাবে নাড়িয়ে ফোকাস ঠিক করা যায়। আলো প্রাইমারি মিররে পরার পর প্রতিফলিত হয়ে সেকেন্ডারি মিররে পড়বে তারপর সেই আলো প্রবেশ করবে জেমস ওয়েব এর মূল অংশে। একে বলা যেতে পারে হার্ড। সেখানে বসানো হয়েছে বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক সেন্সর এবং এই সকল সেন্সরগুলো এক একটি বিষয় নিয়ে কাজ করবে। প্রথমে রয়েছে NIRCAM. এর মূল কাজ হচ্ছে স্টার কিংবা গ্যালাক্সির উজ্জ্বল আলো ব্লক করে দিয়ে ওই উজ্জ্বল বস্তুর আশেপাশে কি রয়েছে তা জানা। কারণ কোন একটি উজ্জ্বল আলোর আশেপাশে যদি কিছু থাকে তা দেখা যায় না। কিন্তু ঐ উজ্জ্বল আলোকে যদি ব্লক করে দেওয়া যায় তাহলে তার আশেপাশে কি রয়েছে তা খুব সহজেই বোঝা যায়। এবং এই কাজটি করবে NIRCAM. কিন্তু এর মাধ্যমে কিন্তু উজ্জ্বল আলোর আশেপাশে যে সকল গ্রহ রয়েছে তাদের ফিজিক্যাল প্রপার্টি জানা যাবে না।এর পরে রয়েছে NIRSPEC. যা আলোর স্পেকট্রাম নিয়ে কাজ করবে। তাছাড়া রয়েছে সোলার প্যানেল যা পাওয়ার সাপ্লাই করবে। এছাড়াও রয়েছে কমিউনিকেশন অ্যান্টেনা যা প্রতিদিন প্রায় 28 দশমিক 6 গিগাবাইট ডাটা পাঠাতে সক্ষম। এন্টেনা সবকিছুর রয়েছে সানসিল্কের হট সিটের দিকে তাছাড়া সেখানে কিছু জ্বালানিও স্টোর করে রাখা হয়েছে। এই হচ্ছে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ মোটামুটি এর আদ্যোপান্ত ।