শহরের ছেলে নাবিল।সম্প্রতি, অনার্স ৩য় বর্ষের সমাপিকা পরীক্ষা দিল সে। শহরতলীর ঝিগাতলার একটি ছোটখাটো মেসে বসবাস করে সে।
টিউশন আর রহিম মামার চা দোকানে রাত্রিবেলায় কাজ করে। মধ্যরাত পর্যন্ত নানা লোকজন আর খদ্দেররা ভীড় জমায় তার ঐ টঙের দোকানে। চা পান বিড়ি -সিগারেটের জন্য ভালো একটি আসর। বিকেলে টিউশনি আর সন্ধ্যের রুপালী আভার রাত্তিরে দোকানে বসে পড়ে।
Source
মাসশেষে ফুটি পয়সা আর কিছু টাকাকড়ি উপার্জন করে নিজের সংসার নিজে চালায়।কষ্ট করে সেই মোরগডাকা ভোরবেলা থেকে শুরু করে, কলেজের পড়াশুনা, ক্লাসপরীক্ষা, দুপুরে চন্দুর হোটেলের কড়কড়া ডিমভাজি, মাছের ঝোল, গরম ভাত খেয়ে, পড়ন্ত বিকেলে টিউশনি করতে বের হওয়া, বিকেলে রেলস্টেশনের দোকানে এককাপ গরম চা, সন্ধ্যার পর রহিম মামার দোকান সামলানো,
এ হলো নাবিলের নিত্যদিনের কাজকর্ম।
নিছক পরিবারের টানাপোড়েনে, গ্রাম থেকে শহরের পানে ছুটে আসা, শূন্য হাতে এ নির্দয় কর্কশ শহরে কাজের সন্ধানে হাতড়ে বেড়ানো, এ গলি ও গলি, নয়তো কোন পত্রিকার অফিসে ধর্না দেয়া, পরের দিন আবার বেরিয়ে পড়া, এ ছিল নাবিলের রোজকার কাজকর্ম। কখনো নিজের খাওয়া পরা সামলিয়ে শখের ঘরে যাওয়ার সাধ্য ছিল না। মাসশেষে মেসের ভাড়া চুকিয়ে বাড়িওয়ালাকে বিদায় করা, কলেজের সামান্য বেতন পরিশোধ, তারপর বাড়িতে টাকা পাঠানো সম্ভব হয়ে উঠতো না নাবিলের।
সে, তারপর রাত্রিবেলা রহিম মামার দোকানে কাজের দায়িত্ব নিল। রহিম মামা সম্প্রতি বিদেশ চলে যাবে, তাই পুরো দোকানের মালিকানা নাবিলকে দিতে চায়। নাবিল সেই ৪ বছর ধরে জমানো টাকা দিয়ে দোকানটি কিনে নিল।
তারপর, নাবিল ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হতে শুরু করলো। মাসশেষে, মোটামুটি ভালোভাবে নিজেকে সামলিয়ে তার গ্রামে থাকা পরিবারের জন্য টাকা পাঠাতে পারতো। এভাবেই চলতে লাগলো নাবিলের দিনকাল।
নাবিলের কলেজ জীবনে স্নেহা ছিল তার হৃদয় জুড়ে থাকা এক পরদেশী৷ প্রেম জিনিসটা সবাইকেই নাড়া দেয়। বিশ্বসংসারের শুরুই তো প্রেম দিয়ে। এ এমন এক লীলারহস্য যার মহিমা খুবই দুরূহ ব্যাপার। প্রেম জিনিসটা নাবিলকেও নাড়া দিল যা সে বুঝতেই পারে নি। অপরিমেয় ভালোলাগা সবার জন্য কাজ করে না। নাবিল তেমন গর্জিয়াস আড়ম্বরে দাপিয়ে বেড়ানো ছেলে নয়। আর ৫-১০টা ছেলের মতো জেল মাখানো চুল, ভালো দামী কাপড়চোপড়, মোটরসাইকেল ঘুরিয়ে, চশমা চোখে আধুনিক ছেলেদের মতো নয়। তাকে দেখে ভালোলাগার কিছু নেই। তারপরেও স্নেহার জন্য তার অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে।
হৃদয়হরন করে থেমে থেমে যায় তার ভাবনা, চোখ জুড়িয়ে যায়, সে তখন অন্য রকম ভালোলাগায় ডুবে যায়।
স্নেহা আর নাবিলের স্ট্যাটাসটা ঠিক মেলে না। স্নেহার বাবার অঢেল সম্পত্তি, গাড়ি বাড়ি, সুনাম সবই আছে। অন্যদিকে নিঃস্ব পরিবারের একমাত্র সহায় নাবিল। তার কাঁধে অনেক দায়িত্ব। নিজেকে গুছানো, ভাঙা পরিবারকে জোড়া লাগানো, নিজের পায়ে দাঁড়ানো আরো কত কি!
Source
সন্ধ্যে নামার মুখে, সে ফেরত এলো তার নিজের কেনা টঙের দোকানে। ভাবতে লাগলো স্নেহার কথা। সহজ সরল মেধাবী, মায়া ধরা মুখের মেয়েটা। কলেজের আবহে থেকে মেয়েটির চরিত্র চেনা হয়ে গেছে তার। নির্ঝঞ্ঝাট, লোভহীন, শিখাদীপ্ত এক মুখ, কখনো নাবিলের কাছে মুখফুটে কিছু চায়নি। প্রচুর ধনসম্পদের পাহাড়ে থেকেও অহংকার নেই বিন্দুমাত্র।
নাবিলের সাথে প্রায়ই কথা হতো তার, কেমন আছো, আন্টি কেমন আছে, পড়াশোনায় অমনোযোগী কেন, আরো কত প্রশ্নের ফুলঝুড়ি। মনে হয় কত আপন যেন সে, নাবিলের স্বপ্নীল নীলিমায় পাখা মেলে ওড়ে বেড়ানো শুভ্র নির্মল রূপকথার রাজপঙ্খী।
নাবিল তাকিয়ে থাকে, সময় যেন থমকে যায়, সে ভাবে আর ভাবে....
রাত নামলে প্রায় দশ বারো কয়েক মানুষ তার দোকানে এসে আড্ডা জমায়৷ নানা ধরনের কথাবার্তা, আমোদ প্রমোদ, আলাপ প্রলাপ, চায়ের কাপে ঝড়ের বন্যা বয়ে দেয় দোকানের টুলে বসে। শহুরে রাজনীতি থেকে শুরু করে, খেলাধুলা, পারিবারিক বিষয়, ব্যবসা বাণিজ্য আরো কত কি! নাবিল ভাবে নিজের একটি ছোট্ট চা দোকান থাকার মজাই আলাদা।
কত জনের কত কাহিনী শুনা যায়।
বেলা এগারোটায় দোকান বন্ধ করে নাবিল নিজের মেসের দিকে যাওয়া শুরু করে, রাত নেমেছে চারপাশে, আকাশের পানে ঘুটঘুটে অন্ধকার, গুড়ুম গুড়ুম মেঘ ডাকছে, বর্ষা এলো বলে...নাবিল বর্ষা মরসুৃম খুব পছন্দ করে, কেননা সে নিজে ভালো রাঁধতে জানে, ডিমসেদ্ধ করে, চালডাল আর মশলাবাটা দিয়ে ভালো করে খিঁচুড়ি পাকিয়ে ঝমঝমে বৃষ্টিধারায় ঘরের কোনে টেবিলে বসে ভোজন দেওয়ার মজাই আলাদা।
সে জানে এ কথা, পরের দিন খিঁচুড়ি পাকানোর চিন্তা করতে থাকে সে। রাতের খাওয়া শেষ করে লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে চোখ টলমল করে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়৷ রূপসাগরে ডুব দিয়ে অন্য এক স্বপ্নে ঘুরে বেড়াতে থাকে নাবিল........
চলবে......