উষ্ণের জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।
মা হিসেবে উষ্ণ তার নানিকেই পেয়েছিল বুঝ হওয়ার আগে এবং পরে। সেই নানির শেষ সময়টা পর্যন্ত নানা-নানি আর ছোট মামার সাথেই ছিল উষ্ণ। সবকিছু কেমন খুব তাড়াতাড়ি ঘটে গেল, নানি টা হঠাৎ চলে গেল না ফেরার দেশে। নানি চলে যাওয়ার ২দিন আগেই ছোট মামার ছায়া হারিয়ে উষ্ণ গেল মেজ মামার ছায়ায় থাকতে।
নানি তখন হাসপাতালে, নানির সাথে উষ্ণ হাসপাতালে থাকার জন্য গেল মেজ মামা কে নিয়ে। গিয়ে নানির অসুস্থতায় ঘেরা চোখের দিকে তাকিয়ে তেমন কিছুই বলতে পারলো না উষ্ণ কিন্তু কিছুদিন আগেও কিন্তু এই হাসপাতালের বেড এ নানির কোলে উষ্ণ মাথা রেখে শুয়ে ছিল আর নানি উকুন এনে দিচ্ছিলো আবার ২/১ টা উকুন এনে মারলোও। তো কিছুক্ষণ পরে এশার নামাজের সময় হওয়াতে উষ্ণ গেল নামাজ পড়তে, নানির সাথে ছিল তখন এক খালা আর মেজ মামা। উষ্ণর তখনকার নামাজের দোয়া টাই সম্ভবত হতো নানির সুস্থাতা কামনা নিয়ে কিন্তু সৃষ্টিকর্তা কেন যেন উষ্ণের এই চাওয়া টা কানে নিল না। নামাজ শেষে লিফট দিয়ে উপরে উঠছিল, লিফটের গেইট খুলতেই চোখে পরলো দুরে তার মেজ মামা ডাক্তারদের কাছে দৌড়াদৌড়ি করছে আর কান্না করছে। উষ্ণ দৌড়ে গিয়ে মামা কে জিজ্ঞাসা করলো,
কি হইছে মামা? কান্দেন কেন?
মামাঃ মা আর নাই রে।
উষ্ণ তখন কি বলবে বুঝতে না পেরে দৌরে গিয়ে দেখে নানির নিথর দেহটা পরে আছে আর পাশে খালা চিৎকার করে কাদছে, পরে মামাও জোগ দিল খালার সাথে। উষ্ণ বুঝে উঠতে পারছিল না কি করবে বা কি হচ্ছে। আরেহ! কিছুক্ষণ আগেই তো দেখে গেল তার নানি কথা বলছে, হাসি ঠাট্টাও করছে টুকটাক। মেজ মামা কাদতে কাদতে যায়যায় অবস্থা। উষ্ণ তখন তার মেজ মামা কে সান্ত্বনা দিচ্ছে আর পাশের কেবিনের মহিলাটা এসেও বুঝলো যে উষ্ণ কোন কষ্ট পাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর মামা, খালা সবাই কেন যেন রুমের বাহিরে গেল, উষ্ণ তখন নানির সাথে একা। উষ্ণ আসতে করে নানির মাথার পাশে বসলো তারপর কানের পাশে গিয়ে আসতে আসতে ডাকতে লাগলো,
নানি, ও নানি, উঠেন না নানি।
কিন্তু উঠলো না। উষ্ণ তার নানির কপালে একটা চুমু দিয়ে কান্না শুরু করলো। পাশের রুমের সেই মহিলা টা একটু পরে এসে উষ্ণকে কাদতে দেখে বলতে লাগলো যে এতক্ষণ শক্ত ছিল এখন কাদছে কেন। উষ্ণ পরে সেখান থেকে উঠে পাশে একটা ফাকা জায়গায় গিয়ে কাদছিল। কিছুক্ষণ পরে উষ্ণের বন্ধু রাশেদ, আজিজুল, নিপুন এসে উষ্ণ কে সান্ত্বনা দিতে লাগলো। নিজের মানুষ পেয়েছে মনে করেই হয়তো উষ্ণ তখন রাশেদ কে জড়িয়ে ধরে কাদতে কাদতে মেঝে তে বসে পড়লো। তারপর অনেক্ষণ পরে নানির লাশ নিয়ে বাসায় এরপর গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়া হলো সমাধির জন্যে। নানির লাশের গাড়িতে বসেই উষ্ণ তার মেজ মামা কে বললো,
মামা, আমাকে কিছুদিন আপনার সাথে রাখবেন? আমি না এখন একা থাকতে পারবো না।
মামাঃ আমার সাথেই থাকিস, মামা।
গ্রামে গিয়ে নানির সমাধির কাজ শেষ করে মেজ মামার সাথে সেদিনই ফিরলো উষ্ণ। কিছুদিন পর অফিসে গেল কিন্তু মন টিকলো না, ছুটি নিয়ে চলে আসলো। এভাবে কিছুদির যাওয়ার পর কুরবানির ঈদের ছুটি আসলো আর এই ঈদের সকাল টা নানির পাশে থাকার উদ্দেশ্যে মেজ মামার সাথে গ্রামে গেল উষ্ণ আর ঈদের দিন সকালে কবর জিয়ারত করে তারপর তারা ঢাকায় ফিরলো। ঢাকায় ফিরে উষ্ণ ঠিক করলো কোথাও ঘুরতে গিয়ে কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করবে। তারপর অনেক কষ্টে মেজ মামা কে ম্যানেজ করে তার ফ্যামিলির সাথে কিছুদিন ঢাকার বাহিরে থেকে আসলো আর ঢাকায় ফেরার পর মানসিকভাবে ভেঙে পরার কারণে উষ্ণের জীবনের প্রথম চাকুরি টা আর কন্টিনিউ করলো না।
মেজ মামার বাসায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় ছিল তখন উষ্ণ। তারপর কয়েক মাস এভাবে পার করার পরে নতুন একটা চাকুরি পেল। চাকুরি পাওয়ার পরে খরচের জন্য অফিস থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে বা অনলাইনে টুকটাক কাজ করে হাতে অল্প কিছু টাকা থাকলেও মেজ মামা কখনো টাকা ধার চাইলে না করতে পারতো না উষ্ণ। এমনও হয়েছে যে অফিস থেকে ২ হাজার টাকা অগ্রিম নিয়ে ১ হাজার টাকা তার মেজ মামা কে ধার দিয়েছে। এভাবে বেশ কিছু টাকা ধার দেওয়া হয়ে গেছে যেটা মনে মনে উষ্ণ জানতো যে কতো টাকা দিয়েছে। কখনো লিখে রাখার কথা বা কতো টাকা দিল সেটা মামা কে মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি উষ্ণ কারণ তার বিশ্বাস ছিল যে সে যেই টাকার কথা বলবে সেটা তার মেজ মামা অবিশ্বাস করবেই না। ১মাস পরেই চাকুরি টা চলে গেল উষ্ণের আর এরপর থেকে সে বাসায় বসেই অনলাইনে কিছু করার চেষ্টা করলো আর তখন সে একটা সাইটে কাজ করতো যেখান থেকে বিদেশি ডলার পেতো তার স্কিল নামক অনলাইন ব্যাংকে। অনেক সময় ধরে ছোট ছোট কাজ করে টুকটাক ইনকাম হওয়ার অবস্থায় ছিল কিন্তু এমন অবস্থায় মেজ মামার বাসার কম্পিউটার টা নষ্ট হওয়ায় কাজ করতে পারছিল না। মাঝেমাঝে বড় মামা আর ছোট মামার শেয়ারের ফটোকপির দোকানটায় গিয়ে চেষ্টা করতো একটু কাজ করার কিন্তু ছোট মামা বিষয়টা খেয়াল করে দোকানের কর্মচারিকে বলে দিল যাতে উষ্ণ দোকানে না ঢুকে। নিজের বলে ছিল না কোন কম্পিউটার, পকেটে ছিল না টাকা, মানসিকভাবে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য গার্লফ্রেন্ড টা ছাড়া তেমন কেউই ছিল নি। আবার এদিকে মেজ মামার বাসায়ও কদর কমতে থাকলো আর নিজেকে বোঝা মনে হতে লাগলো। বেশ কিছুদিন পরে নতুন একটা চাকুরি পেল উষ্ণ আর তার কিছুদিন পরে টাকা দরকার থাকায় উষ্ণ মেজ মামা কে দেওয়া ধারের টাকা টা ফেরত চাইলো। কিন্তু মেজ মামা ডিরেক্ট জানালো যে এতো টাকা সে নেয়নি। উষ্ণ তখন অবাক হয়ে গেল এই ভেবে যে, ছোট বেলা থেকে আজ পর্যন্ত কিছু কিনে এনে ২/৫ টাকাও না বলে নিলাম না আর আজ আমাকে মিথ্যাবাদি ভাবলো? তারপর ২/১ কথায় মেজ মামা উষ্ণকে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বললো। উষ্ণ তখন সেই রাতের বেলা ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের অন্ধকার গলিতে দাড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ একা কাঁদলো আর তারপর বুকে পাথর চাপা দিয়ে কাছাকাছি ছোট খালার বাসায় গেল কিছুদিন থাকার জন্যে। ব্যাচেলর বাসা ঠিকঠাক করার পর ছোট খালার বাসায় মাসের বাকি কয়টা দিন থাকার অনুমতি পেল। কিন্তু একটা সময়ে ব্যাবহার ঠিকটাক মনে না হওয়ায় ৩/৪ দিন আগেই উষ্ণ তার ব্যাচেলর বাড়ির মালিককে রিকুয়েষ্ট করে এই ৩/৪ দিন ১টা সিটে থাকার অনুমতি পেল। শুরু হয়ে গেল উষ্ণের একা থাকার দিন, ব্যাচেলর জীবন, যে জীবন উষ্ণের কাছে সম্পূর্ণ নতুন। মাস শেষে নিজের সিটে উঠলো বটে কিন্তু রুমমেট সুবিধার না হওয়ায় এক মাসের অগ্রিম ভাড়া দিয়ে এক রুম একা ভাড়া করে উঠলো উষ্ণ।
নতুন চাকুরির সাথে সবকিছু ঠিকঠাকভাবেই চলছিল কিন্তু হঠাৎ উষ্ণের গার্লফ্রেন্ডের বাসায় কিছু সমস্যা দেখার পর উষ্ণ বাধ্য হলো গার্লফ্রেন্ডকে বউয়ের মর্যাদা দেওয়ার। আর্থিকভাবে কারও কাছ থেকে কোন সাহায্যের আশা না করে অফিস থেকে লোন নিয়ে বিয়েতে ছোটখাটো অনুষ্ঠান করে নিল। নতুন বউকে নিয়ে সেই এক রুমের ব্যাচেলর বাসায়ই নিজের সংসার সাজাতে লাগলো। তারপর সেই লোনের টাকা শোধ করতে হলো প্রতি মাসের বেতন থেকে, তো বেতনের অবশিষ্ট টাকা দিয়ে কোনরকমভাবে চলতে শুরু করলো উষ্ণ। বিয়ের এক মাস না যেতেই করোনার জন্য লকডাউন পড়লো আর তারপর কাজ না থাকায় প্রায় ৩ মাস অফিস থেকে অনেকটা কাজ ছাড়াই বেতন গুনতে লাগলো উষ্ণ। কিন্তু সেই সুবিধাটা আর বেশিদিন চললো না, মালিকপক্ষ বুদ্ধি করে উষ্ণের সাথে খারাপ আচরণ করতে শুরু করলো যেটার জন্যে উষ্ণ বাধ্য হলো চাকুরি টা ছেড়ে দিতে। এর মাঝে বন্ধুর পুরাতন সিপিইউর সাথে নতুন মনিটর কিনে একটা ডেস্কটপ রেডি করেছিল উষ্ণ। চাকুরি যাওয়ার পরে অনলাইনে টুকটাক ইনকাম করতে লাগলো উষ্ণ আর তার বউও কাজে সাহায্য করতে লাগলো। উষ্ণ আর তার নতুন বউ কম খেয়ে, কম পরে জীবনযাপনের চেষ্টা করছিল তখন। এভাবে চলে গেল প্রায় ৫ মাস। এরপর তারা নতুন বাসা ভাড়া নিয়ে এলাকা পরিবর্তন করার পরেও প্রায় আরো ৬/৭ মাস এভাবেই কষ্টের জীবনযাপনের পরে নতুন চাকুরি পেল।
এতোটা কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে আজ উষ্ণ তার বউকে নিয়ে আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো আছেন আর এর জন্যে আল্লাহর কছে অনেক শুকরিয়া জানান তারা। আজ বউয়ের ছোট ছোট ইচ্ছাগুলো অপুর্ণ রাখতে হয় না, গরুর মাংস খেতে ইচ্ছা হলে টাকা নেই ভেবে ইচ্ছা টা মেরে ফেলতে হয় না। কাজ করার জন্য কম্পিউটার না পাওয়া উষ্ণের ঘরে আজ ২টা কম্পিউটার। এই কঠিন পথ পারি দেওয়ার সময়টা তে, জীবনের এই টার্নিং পয়েন্টে আর যাই হোক না কেন, উষ্ণ তার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে স্মরণে রেখেছেন আর সে বিশ্বাস করেন যে আল্লাহর রহমতেই আজ বর্তমানে তার কোন বড় সমস্যা নেই আর সে এও বিশ্বাস করেন যে আল্লাহ যা করছেন সব ভালোর জন্যেই করছেন। জীবনের হতাশার সময়টাতে হতাশ না হয়ে উষ্ণ আল্লাহর সাহায্য কামনা করেছেন আর মহান দয়ালু আল্লাহ এবার তার বান্দাকে ফিরিয়ে দেন নি।
** চলবে... **
"Be Good, Think Good and Do Good"