আল-বেরুনি হল। গত সাত বছরে অবসর সময়ে এই হলে সব থেকে বেশি আড্ডা দিয়েছি। ডিপার্টমেন্টের বন্ধু শাওনের মাধ্যমে প্রথম এই হলে আসি। ২০১৫ সালে ভার্সিটিতে প্রথম কনভোকেশন দেখেছিলাম আমরা। সারা ক্যাম্পাসে কালো গাউন পরে সিনিয়ররা ছিলো। তখন আমরা সবে মাত্র প্রথম বর্ষ শেষ করবো। ক্যাম্পাস সাজানোর দায়িত্ব চারুকলা ডিপার্টমেন্টের উপরে ছিলো। সারাদিন রাত কাজ করে ক্যাম্পাস ঘুরছিলাম আমরা। তখন আমি ঢাকা থেকে ক্লাস করতাম। হলে থাকা হতো না। সকাল সাতটার দিকে আল-বেরুনি হলে শাওনের রুমে গেলাম। তখন মাত্র গণরুম থেকে নতুন রুম দেয়া হইছে ওদের। দুইজনের রুমে গাদাগাদি করে প্রায় ১০-১২ জন শুয়ে আছে। ঘুমের মধ্যে কেউ যদি একবার উঠে বাথরুমে যায় এসে দেখবে ওর জায়গা নাই হয়ে গেছে। আমি আর সাথে আরও দুইজন বন্ধু মিলে শাওনের রুমে যেয়ে ওকে ঘুম থেকে ডেকে তুললাম। ও আগেই হলে চলে এসে ঘুমিয়ে গেছিলো আর আমরা ক্যাম্পাস ঘুরছি। শাওন কে ডেকে তোলার কিছুক্ষণের ভিতরেই দেখি ওর জায়গা হাওয়া হয়ে গেলো। আমাদের আর বিশ্রাম নেয়া হলো না। শাওন কে নিয়ে বেরিয়ে পরলাম আবার ক্যাম্পাস ঘুরতে।
স্থপতি মাজহারুল ইসলামের করা এই হল। তার করা প্রতিটি স্থাপনা আমার কাছে অসম্ভব ভালো লাগে। শুধু আমার কাছেই না যে দেখবে তারই ভালো লাগবে। আমি যতবারই এই হলে ঢুকি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। স্বর্গ মনে হতো আমার কাছে এই হল। ছাদে উঠলে এতো বাতাস আর চারিদিকে খোলা। হলের পিছন দিকে বিশাল মাঠ। আগে এটাই ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠ। এখানেই খেলাধুলা হতো। এখন এখানে কাশফুল ফুটে থাকে অসম্ভব সুন্দর লাগে। আকাশে মেঘ লাগলেই চলে যেতাম হলের ছাদে। ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে অনেক ভালো লাগতো। তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষে প্রায় প্রতিদিনের রুটিন ছিলো অনেক ভোরে ঘুম থেকে উঠতাম। ফ্রেশ হয়ে সোজা আল বেরুনি হলে চলে আসতাম। ৪১০ নাম্বার রুমে এক সিনিয়র ভাই থাকতো। সাথে আর এক ভাই চলে আসতো ভাসানী হল থেকে। একসাথে ছাদে বসে সিগারেট টানতাম আর আড্ডা দিতাম। কিছুক্ষণ পরেই নাস্তার জন্য চলে যেতাম ট্রান্সপোর্টে। জালাল ভাইয়ের সেই স্পেশাল নাস্তা করতে। আর ছিলো শাওনের ৪৩২ নাম্বার রুম। এই রুমে গানের আসর বসতো। কতো রাত এখানে আড্ডা দিতে দিতে সকাল হয়ে গেছে তার কোন ঠিক নেই। এই হলে আমার সবথেকে পছন্দের রুম ছিলো শাওনের রুম। একা একা কত এসে বসে থেকেছি। করোনার কারনে প্রায় দের বছর শাওনের রুমে যাওয়া হয় না। সব কিছু স্বাভাবিক হলে আবারও যেয়ে আড্ডা দিবো, গানের আসর বসাবো, সবাই সুখ দুঃখের আলাপ করবো।
রাস্তার বাম পাশে হলের ক্যান্টিন। খাবারের মান তেমন নেই বললেই চলে। তবুও হলের ক্যান্টিনে প্রায়ই দুপুরে খাওয়া হতো। দাম তুলনামূলক কম ছিল। পকেটে টাকার সংকট থাকলেই চলে আসতাম। ডিপার্টমেন্টের কাছে হওয়াতে সময়ও অনেক বেচে যেতো। বটতলা যেতে হতো না রিক্সা ভাড়াও বেচে যেতো। এই ক্যান্টিন চালানোর দায়িত্ব ছিলো কালু ভাইয়ের। খাবারের মানের কারনে প্রায় সময়ই তাকে ঝারি দেয়া হতো। তিনি এইসব কোন কিছুই গায়ে লাগাতো না। এক কান দিয়ে শুনে অপর কান দিয়ে বের করে দিতো। এখন ক্যাম্পাস বন্ধ থাকার কারনে এইসবও অনেক মিস করি। কতদিন কালু ভাইয়ের সাথে খাবার নিয়ে ক্যাঁচক্যাঁচ করা হয় না। সবকিছু স্বাভাবিক হলে জানিনা কালুভাই আবার ক্যান্টিন নিবে কি না কিন্তু এইসব ক্যাঁচক্যাঁচ অনেক মিস করবো।