নীলের বেশ কয়েকদিন থেকে মন ভীষন খারাপ। কালকে ওরা লালমনিরহাট ছেড়ে চলে যাবে। ওর বাবার চাকুরীর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। নীল জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। কোন কিছুই ভালো লাগছে না ওর। ও এখানে সরকারি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলো। ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পরছে। নীলের বাবা সরকারী অফিসার হওয়ার সুবাদে কোয়ার্টারে থাকতো ওরা। তিন ভাইয়ের মধ্যে নীল সবার ছোট। কোয়ার্টারে থাকার ফলে আসে পাশের বিল্ডিংয়ের অনেক বন্ধু ছিলো ওর। কালকে যখন ওরা এখান থেকে একেবারে চলে যাবে এই বন্ধু-বান্ধব আর কেউ থাকবে না। আবার দেখা হবে কি না সেটাও জানে না। নীলের সব থেকে কাছের বন্ধু ছিলো সিজান। নীল যখন প্রথম লালমনিরহাটে আশে তখন সবার আগে ওর সিজানের সাথে বন্ধুত্ব হয়। সিজান ছিলো এখানকার টি.এন.ও এর ছেলে। স্কুলে যেয়ে প্রথম নীলের সাথে সিজানের পরিচয় হয়। আস্তে আস্তে আলিফ, স্বপ্নীলের সাথে বন্ধুত্ব হয়। প্রতিদিন স্কুল শেষে ওরা একসাথে বাসায় ফিরে কোয়ার্টারের মাঠে ক্রিকেট, ফুটবল খেলতো। কালকে থেকে নীল আর এদের কারো সাথে খেলতে পারবে না। নতুন জায়গাতে যেয়ে আবার নতুন নতুন বন্ধু হবে তার। তবে তার মনে হয় এদের মত বন্ধু আর কোথাও সে পাবে না। এখানে সে যে পরিমান মজা করছে এতো এতো স্মৃতি আছে এইসব ভেবে নীলের মন অনেক খারাপ হয়ে আছে। এইসব ভাবতে ভাবতে বাসা থেকে বের হলো নীল। কোয়ার্টারের কিছু দুরেই একটা রাজবাড়ী ছিলো। ওদিকটায় হেটে হেটে গেলো আর ভাবতে থাকলো এই রাজবাড়ী নিয়ে বন্ধুদের নিয়ে কত প্লান ছিলো। মাঝেমাঝেই ওরা রাজবাড়ী ভিতরে যেয়ে অনেক জায়গা খোড়াখুড়ি করতো। যে যা পারতো বাসা থেকে নিয়ে আসতো খোড়ার জন্য। নীল জন্মদিনের কেক কাটার একটা চাকু ছিলো ও এটা নিয়ে সবসময় আসতো। ওদের সবার মনে ধারনা ছিলো আগের জমিদার যারা এখানে থাকতো তারা নিশ্চয়ই এখানে অনেক গুপ্তধন লুকিয়ে রেখে গেছে। মাটির নিচে সিন্দুকে নিশ্চয়ই অনেক সোনাদানা লুকানো আছে। কিন্তু ওদের মাটি খোড়াঁর জন্য ভালো কোন সরঞ্জাম ছিলো না। এরকম কেক কাটা চাকু দিয়ে আর কতটুকুই বা খোড়া যায়। রাজবাড়ীর ভিতরে এতো পরিমান জংগল ছিলো যে কেউই ঢুকতে তেমন সাহস পেতো না। নীলের ধারনা ছিলো একদম ভিতরের দিকে ঘরগুলো ছিলো ওদিকে যদি খোঁজা যেতো তাহলে নিশ্চয়ই কিছু না কিছু পাওয়া যেতো। কিন্তু এখন আর কোন সময় নেই। এই একদিনে আর কোন কিছু করা সম্ভব না। এইসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ নীলের মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো। আজকে রাতেই সব বন্ধুদের নিয়ে ও গুপ্তধন খুজতে আসবে। যদি ভাগ্যক্রমে কিছু পেয়ে যায়। যেই ভাবা সেই কাজ এক দৌড়ে চলে গেলো সিজানের বাসায়। ওকে সব প্লান বলার পরে প্রথমে রাজি হচ্ছিলো না। ও আসলে একটু ভয় পেয়ে গেছিলো কারন রাতে সিজান কে ওর বাবা মা কখনো বেরতে দিতো না। তবে আজকে রাতে নীল ওর বাবা মার সাথে কথা বলে ম্যানেজ করে নিবে। আলিফ আর স্বপ্নীল কে নিয়ে কোন সমস্যা নাই। ওদের বললে যেকোন সময়ই বাসা থেকে বেরতে পারবে। ওরা সবাই একসাথে বসে ঠিক করলো মাগরিবের আজানের পরেই ওরা জমিদার বাড়ির দিকে চলে যাবে। সন্ধ্যার পরেই ওদিকে লোকজন কেউ থাকে না। তখন ওরা নিশ্চিন্তে ওদিকে যেয়ে খোড়াখুড়ির কাজ করতে পারবে। নীল সাথে করে তার স্পেশাল কেক কাটার চাকু, সিজান কাটাচামুচ, আলিফ রান্না করা খুন্তি আর স্বপ্নীল একটা রড নিয়ে রাজবাড়ীর দিকে এগিয়ে চললো। রাজবাড়ীর কাছাকাছি আসতেই ভয়ে সবার গা কেমন ছমছম করতে শুরু করলো। কারন সন্ধ্যার পরে থেকেই এদিকে কোন মানুষ থাকে না। রাজবাড়ীর গেট দিয়ে ঢুকে কিছুদুর ঢুকেই কেউ আর সাহস করতে পারতেছিলো না। এতো জংগল আশেপাশে সাপ পোকামাকড় অনেক কিছুই আছে এখানে। সবাই রাজবাড়ী থেকে বের হয়ে আসতে চাইছিলো কিন্তু নীলের কথা ভেবে সবাই ভিতরের দিকে গেলো। সবাই ভিতরে যেয়ে একটা জায়গা ঠিক করে খোড়া শুরু করলো। নীল ওর চাকু দিয়ে, সিজান কাটাচামুচ, আলিফ খুন্তি আর স্বপ্নীল রড দিয়ে। প্রায় ঘন্টাখানেক খোড়ার পরেও দেখলো ওরা অল্প একটু খুড়তে পারছে। এর মধ্যে হটাৎ করে নীলের চাকু গেলো ভেংগে। তখন খোড়াখুড়িও বন্ধ হয়ে গেলো। সবাই তখন বুঝতে পারলো এভাবে আসলে খুজলে গুপ্তধন পাওয়া সম্ভব না। নীল কে সান্তনা দিতে দিতে সবাই বাসার দিকে হাটা ধরলো। গুপ্তধন আর ওদের খোঁজা হলো না। পরের দিন সকালে নীলরা লালমনিরহাট ছেরে চলে গেলো।