অবশেষে সময় চলে আসলো ক্যাম্পাস ছাড়ার। ঢাকায় নতুন বাসায় চলে যেতে হবে। সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে উঠলাম। অনলাইনে পরীক্ষা ১০ টা থেকে। ব্যাবহারিক পরীক্ষার কাজ জমা দেয়ার শেষ দিন এখনও কাজ সম্পন্ন করতে পারি নাই। এদিকে জিনিসপত্র সব গুছাতে হবে। অনেক কাজ পরে আছে। ব্যাবহারিক কাজ শুরু করে দিলাম ফ্রেশ হয়ে। সকাল ১০ টায় জুম কলে জয়েন করলাম। কাজ যা করেছি ম্যাম কে দেখায় বললাম আজকে বাসা চেঞ্জ করবো। আমি আগামিকাল সকালে ভাইভার আগে মেইল করে কাজ জমা দিবো। জুম কল শেষ করে জিনিসপত্র সব গোছাতে শুরু করলাম। ভেবেছিলাম অল্প কিছু জিনিস বেশি সময় লাগবে না। বাট গুছাতে যেয়ে দেখি অনেক জিনিস হয়ে যাচ্ছে। বিকাল তিনটায় পিকাপ আসবে। বাসায় দুইজন জুনিয়র ডাকলাম হেল্প করার জন্য। ওদেরকে কিছু জিনিস প্যাক করতে দিয়ে আমি আমার জামাকাপর সব গোছানো শুরু করলাম। কেনো জানি জেতেই ইচ্ছা করছে না। কত কত স্মৃতি মনে পরছে এই বাসার। সাড়ে তিন বছর ছিলাম এই বাসাতে। আজকে শেষ দিন এই বাসাতে। নতুন ভাড়াটিয়া চলে আসবে। আর কখনো থাকা হবে না। এর মধ্যে খালা চলে আসলো রান্না করার জন্য। দুপুরে আলু ভর্তা, ডাল আর ডিম করতে বললাম। খালারও দেখি মন অনেক খারাপ। রুমের সামনে এসে বলে মামা মাঝে মাঝে ফোন করেন আপনাকে অনেক মনে পরবে। এই কথাটা শুনার পরে আমার আর যেতেই ইচ্ছা করছে না। বুকের ভিতরে কেমন জানি করতেছে। সাড়ে তিন বছর আগে যখন প্রথম এই বাসায় আসছিলাম তখন দেখি খালা নাই। পা ভেঙ্গে গেছে তাই প্রায় মাসখানেক আসে নাই। ভাইদের মুখে শুনতাম খালার রান্না নাকি অনেক ভালো। কিন্তু আমার তখন মনে হয় নাই। কারন আমি আজ পর্যন্ত বাহিরে যত খালার রান্না খেয়েছি কারো রান্নাই তেমন ভালো ছিলো না। খালা সুস্থ হবার পরে যখন প্রথম আসলো রান্না খেয়ে দেখলাম আসলেইতো একদম বাড়ির খাবারের মত স্বাদ।
খালার কথা শুনে আবার সব গোছানো শুরু করলাম। কিছুই দেখি শেষ হয় না। প্রায় দুপুর হয়ে গেছে। পিকাপ থেকে ফোন করে বললো আর একটা ট্রিপে আছে রাস্তায় জ্যাম আসতে দেরি হবে। তিনটায় আসার কথা ছিলো আসতে দেরি হবে শুনে একটু শান্তি লাগলো কারন এখনও সব কিছু গোছাতে অনেক সময় লাগবে। দুপুরের খাবার হয়ে গেছে জুনিওয়দের সাথে নিয়ে খেয়ে নিলাম। এই বাসায় এটাই শেষ খাবার খাওয়া। খাওয়া শেষ করে এবার সব কাটুনের মধ্যে নিয়ে বাধা শুরু করে দিলাম। আকাশে দেখি অনেক মেঘ লেগে আসলো। ক্যাম্পাসের কথা অনেক মনে পরতেছে। এখানে বৃষ্টি যত সুন্দর লাগে জানিনা ঢাকায় কেমন লাগবে। চাইলেই বৃষ্টি হলে আর ক্যাম্পাসে যেতে পারবো না। হয়তো সামনে সময় পেলে ছুটে চলে আসবো কিন্তু তখন বৃষ্টির দেখা পাবো কি না জানিনা। ভিজতে পারবো কি না জানিনা। এইসব ভাবতে ভাবতে পিকাপ থেকে ফোন দিয়ে বললো প্রায় চলে আসছে। সব কিছু তারাতারি গোছায় ফেললাম। পিকাপ চলে আসার পরে সব সব কিছু উঠানো হলো আর সাথে সাথে ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। পলিথিন আর ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেয়া হলো। বৃষ্টির শেষ হবার জন্য ওয়েট করছি সবাই। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বৃষ্টি কিছুটা কমে আসছে। সাথে চারজন জুনিয়রও ঢাকায় যাবে আমার সাথে। রওনা দিতেই আবারও ঝুম বৃষ্টি। তারাতারি করে সবাই পিকাপ থেকে নেমে বাজারেই একটা হোটেলে গিয়ে ঢুকলাম। কিছুখন পরে দেখি বাসার যে তালা নেবার কথা ছিলো আমার নিতে ভুলে গেছি। ছাতা নিয়ে বাসার দিকে গেলাম। দেখি খালা ভাইয়ের জন্য রান্না করতেছে। এবার বাসায় ঢুকে মন এতো খারাপ হয়ে গেলো। কত কত স্মৃতি মনে পরতে থাকলো। আর বেরতেই মন ছাইতেছে না বাসা থেকে। খালার সাথে যেয়ে কিছুখন গল্প করলাম। গলা ধরে আসতেছিলো আমার। সালমান ভাই এখনও অফিস থেকে আসে নাই। আমি যে ভাইয়ের সাথে থাকতাম তার নাম সালমান। ভাই আমাকে একদম ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতো। এতো ভালো মানুষ আমি অনেক কম দেখছি। খারাপ লাগতেছিলো ভাইয়ের সাথে দেখা করতে পারলাম না। এদিকে জুনিয়ররা ফোন করে বললো তারাতারি আসতে। দেরি হয়ে যাচ্ছে। রওনা দেয়া দরকার। রাস্তার কি অবস্থা জানিনা। তখনও টিপটিপ বৃষ্টি পরছে। এর মধ্যে বেরিয়ে পরলাম। ক্যাম্পাস দিয়ে পিকাপ ঢুকালাম। মন কেন জানি সব মেনে নিতেছে। একটা সময়তো আসলেই সব কিছু ছেড়ে চলে যেতে হবে। প্রান্তিক গেট দিয়ে বেরোবার সময় শেষ বার পিছনে তাকিয়ে নিলাম। রেডিও কলোনি যেতেই প্রচণ্ড জ্যাম শুরু। যেতে যে কতক্ষণ কে জানে। প্রায় ৩০ মিনিট জ্যামে বসে থাকার পরে আস্তে আস্তে গাড়ি এগোতে থাকলো। রাস্তায় তেমন আর জ্যাম পেলাম না কিন্তু প্রচণ্ড বৃষ্টি। গাবতলি থেকে আবার জ্যাম শুরু হলো। গাবতলি থেকে আদাবরে আসতে প্রায় ঘণ্টাখানেক লেগে গেলো। গাড়ি থেকে সব জিনিস নামানোর সময় দেখি আমার অনেক জিনিস ভিজে শেষ। তোষক দুইটা ভিজে একদম চুপসে গেছে। ড্রাইভারের উপরে প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হতে লাগলো কিভাবে ত্রিপল দিছে যে সব ভিজে গেলো। সব কিছু বাসায় নিতে নিতে প্রায় রাত ১১ টা বেজে গেলো। ডাল ভাত রান্না করে কোন মতে খেয়ে আমি আবার আমার পরীক্ষার কাজ শুরু করলাম। সারাদিন যে কি একটা গেলো আমার উপর দিয়ে এরপরে আবার এখন পরীক্ষার কাজ। আর কিছু ভালো লাগতেছে না। রাত দুইটার দিকে ঘুমায় পরলাম আর না পেরে। শরীর আর চলতেছে না। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম আগামিকাল থেকে নতুন সকাল দেখবো। চারিদিকে বিল্ডিং আর বিল্ডিং। এইসব ভাবতে ভাবতেই চোখ লেগে আসলো।