ঈদের ছুটিতে কিছুদিন ট্রেন চালু ছিলো। দুলাভাইকে নিতে স্টেশনে গেছিলাম। আগে আমাদের জামালগঞ্জ স্টেশনে কোন ইন্টারসিটি ট্রেন থামতো না। তিতুমির একমাত্র ইন্টারসিটি ট্রেন যেটি প্রথম আমাদের গ্রামে থামতে শুরু করে। আমি তখন ক্লাস নাইন কি টেনে পরি সেই সময় থেকে এই ট্রেন আমাদের জামালগঞ্জ স্টেশনে স্টপেজ দেয়। এটিই একমাত্র ইন্টারসিটি ট্রেন টানা তিনটি স্টেশনে থামে। আগে দাদাবাড়ি যেতে হলে আমাদের এখান থেকে একমাত্র ভরসা ছিলো লোকাল ট্রেন। ভোর পাচ টায় একটি এবং বেলা এগারোটায় একটা লোকাল ট্রেন ছিলো। আমার কখনোই লোকাল ট্রেনে যেতে ইচ্ছা করতো না। প্রতিটা স্টেশনে থামতো যা খুবই বিরক্তিকর ছিলো। দাদাবাড়ী যেতে ইন্টারসিটি তে সময় লাগতো দেড় ঘন্টা আর লোকালে গেলে পাচঁ থেকে ছয় ঘন্টা। আবার প্রতিটা ইন্টারসিটি ট্রেনের সাথে ক্রসিং হতো। দুই থেকে তিনটা ট্রেনের সাথে ক্রসিং হতো। এই সময়টা অনেক বিরক্তিকর ছিলো। আব্বা আম্মার সাথে এটা নিয়ে আমরা ভাইবোন সবসময় চিল্লাচিল্লি করতাম এতো সময় নষ্ট হয় ইন্টারসিটিতে গেলেই হয়। তাদের কথা ছিলো বসে থাকতে তো ভালই লাগতেছে। কিছুক্ষণ পরপর বাদামওয়ালা, ঝালমুড়ি ওয়ালা আসে। অনেক কিছু খাওয়া যায়। লোকজনের সাথে অনেক সময় নিয়ে গল্প করা যায়। এই জিনিস গুলো আব্বা আম্মা অনেক উপভোগ করতো। কিন্তু আমাদের বসে থাকতে মোটেও ভালো লাগতো না। আমার দাদাবাড়ী নাটোরে। সবথেকে বেশি বিরক্ত লাগতো বাসুদেবপুর স্টেশনে এসে যখন কোন ক্রসিং পরতো কারন এই স্টেশন ছিলো নাটোরের আগের স্টেশন। বেশিরভাগ সময়ই এখানে ক্রসিং পরতো। প্রায় ঘন্টাখানেক সময় চলে যেতো এখানে।
স্টেশনের পাশেই আমার স্কুল। এখানে প্রাইমারি ও হাই স্কুল দুটিই ছিলো। কৈশোরের অনেকটা সময় এদিকে কাটছে। স্কুল শেষ করে বন্ধুরা সবাই স্টেশন দিয়ে হেটে হেটে বাসায় আসতাম। যখন কোন ট্রেন যেতো আমরা সবাই হাত নাড়তাম ট্রেনের মানুষের দিকে। দুই একজন আমাদের দেখে হাত নাড়তো। ওই মুহুর্তে এটিই আমাদের অনেক আনন্দ দিতো। কখনো কখনো আমরা লাইন ধরে অনেক দূরে হেটে চলে যেতাম। সন্ধ্যার আগে আগে বাসায় চলে আসতে হতো। এই সন্ধ্যা পর্যন্ত কোথায় ছিলাম বাসায় এসে আব্বা আম্মার কাছে কৈফিয়ত দিতে হতো। কোন সময় যদি জানতে পারতো যে আমরা স্টেশনের দিকে গেছি একটা মাইরও মাটিতে পরতো না। আব্বা শুধু একটু বকাঝকা করতো আর বাকিটা আপুর উপরে ছেড়ে দিতো। রেললাইনের ওদিকটায় এলাকা ভালো ছিলো না এইজন্য যেতে মানা করতো।
রেললাইন ধরে হেটে যেতে যেতে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে একটা ব্রিজ আছে। এই জায়গাটার নাম ভালকির ব্রিজ। এখানে আমরা এসে প্রায়ই বসে থাকতাম। ব্রিজের নিচে বসার জায়গা আছে ট্রেন যখন যেতো পুরো ব্রিজ কেপে উঠতো। ছোট ছিলাম এই সময়টা অনেক ভয় লাগতো। যদি ট্রেন নিছে পরে যায় তখন কি হবে? বাসায় তো বলে আসিনাই আমি এদিকে আসছি। আমি মারা গেলে বাসার সবাই যদি রাগ করে কেন এদিকে গেলাম। অদ্ভুত সব চিন্তা মাথায় আসতো। ভালকি ব্রিজের চারিপাশে বিল। বিলের মধ্যে দিয়ে ট্রেন যাওয়া দেখতে অনেক ভালো লাগতো। লাইনের একপাশেই আবার রাস্তা আছে। একদিকটা দিয়ে ভ্যান অথবা বাসে করে যেতাম সেই মুহুর্তে ট্রেন গেলে অনেক ভালো লাগতো। ভিতরে ভিতরে একটা প্রতিযোগিতা কাজ করতো যে ট্রেন আগে যাবে নাকি ভ্যান অথবা বাস আগে যাবে। কখনই ট্রেনের আগে যাওয়া সম্ভব হতো না। ভালকির ব্রিজে সন্ধ্যার পরে যাওয়া অনেক রিস্কি ছিলো। এখানে অনেক ছিনতাই হয়। ভালকির ব্রিজ পার হয়ে সামনে কিছুদুরে আমার এক বন্ধুর বাড়ি। মাঝে মাঝে ওর বাড়িতে যেতাম। সন্ধ্যা পার হলেই দোয়া পড়তে পড়তে বাসায় আসতাম।