Love For Mother

Words
993
Reading
5 min
Listen
Play
9y

ঘড়ির হিসেব মতে মাকে কবর দিয়ে আসলাম এক ঘন্টা সতের মিনিট আগে। কবরের ভিতর আমিই নেমেছিলাম মাকে শুইয়ে দিতে, ছোট বেলায় আমার বিড়ালের বাচ্চাকে কবর দেবার সময় অনেক কেঁদেছিলাম কিন্তু মাকে কবর দেবার সময় কেন জানি আর সেই কান্না আসেনি । ততক্ষনে আমার চোখের পানি হয়ত ফুরিয়ে এসেছিল, হয়তো ততক্ষনে পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। আমি ছিলাম টিউশনিতে হঠাৎ করেই রাত সাড়ে নয়টার দিকে ছোট ভাইটা ফোন দিয়ে বলল -ভাইয়া মার শরীর খুব খারাপ তুমি এক্ষুনি বাড়ি আসো। দ্রুত বাড়ি চলে আসলাম, হাসপাতালে নেবার আগেই মা মারা গেলেন। অথচ গতকাল দুপুরে মায়ের পছন্দের চিংড়ি মাছ দিয়ে এক সাথে বসে খেয়েছিলাম, মা কচুর লতি দিয়ে চিংড়িটা বেশ ভুনা ভুনা করে রান্না করতে পারত। আমি তো এক বসায় দুই প্লেট খেয়ে নিয়েছিলাম, সকালে বাজার থেকে দুধ এনে রেখেছিলাম মায়ের দুর্বলতা কাটাতে অথচ মারা যাবার আগে সেই দুধ বমি করে ঢেলে দিয়ে আজন্মের মত দুর্বল হয়ে গিয়েছে আমার মা। দুধ তাকে আর শক্ত বানাতে পারলোনা। হাসপাতালে নেবার পথে মা আমার হাতে যখন ঢলে পড়ল তখন ভেবেছিলাম মা হয়তো জ্ঞান হারিয়েছে কেননা এর আগে এমন হয়েছে অনেকবারই কিন্তু না সেদিন আর মা জেগে ওঠেনি। যখন সবাই বলল মা আর নেই তখন আমার মনে হচ্ছিল আমি স্বপ্ন দেখছি ভয়ানক একটা স্বপ্ন, ঘুম থেকে জেগে উঠেই দেখব মা জায়নামাজের উপর দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছে। মাকে বাড়ি এনে ফ্লোরে শুইয়ে দেয়া হল, গায়ে কাথা চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়া হল, মুখটা ঢেকে দেয়া হল। কারা করল সে কথা মনে নেই আমার, আমি চাদর উঠিয়ে যখন আমার মায়ের মুখের দিকে তাকালাম তখন আমার মায়ের মুখটা ইয়া বড় হয়ে আছে, ঠোট দুটো কালো হয়ে গেছে আমার মায়ের। ছোট বেলায় যে ঠোট দিয়ে মা আমায় চুমু খেত সেই ঠোট দুটো আজীবনের মত অকেজো হয়ে গেল! মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম গতরাতে, ছোট ভাইটার মুখের দিকে তাকাবার কথাও মনে ছিল না । সব বন্ধুরা, চাচা চাচী, মামা, মামী সবাই এসেছিল ছুটে সে রাতেই হয়তো তারাও ভেবেছিল তারা ভুল কিছু শুনেছে। সারাটা রাত মায়ের পাশেই বসে ছিলাম বারবার আল্লাহ পাকের কাছে মাকে ভিক্ষে চাইছিলাম, অদ্ভুত হলেও সত্য ঐ মুহুর্তেও আমার মনে হচ্ছিল মা একটু পরেই উঠে বলবে আমি মিথ্যেমিথ্যি মরে যাবার ভান করেছিলাম ঠিক যেমনটা করত সে ছোটবেলায় আমার সাথে। সবাই এসে আমাকে বুঝ দেবার চেষ্টা করছিল কিন্তু আমার যে কোন বুঝ চাই না,আমি শুধু আমার মাকে চাই। ভোরে মসজিদের মাইকে আ্যনানাউন্স করা হল -

"রফিক মিয়ার স্ত্রী শাহেদা বেগম গতকাল রাত এগারো ঘটিকায় নিজ বাস ভবনে ইন্তেকাল করিয়াছেন, ইন্না-লিল্লাহি-ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন। মরহুমার জানাজা সকাল দশ ঘটিকায় ইদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হইবে "

না এবার মনে হচ্ছে আমি আর স্বপ্ন দেখছিনা, সব সত্যি মনে হল। হঠাৎ করেই নিজের চোখের পানি নিজে মুছে ফেললাম। মায়ের কাফনের কাপড় কেনা হল, আগরবাতি, গোলাপজল আনা হল। মাকে যখন গোসল করানো হচ্ছিল তখন পানির আছড়ে পড়া শব্দ আমাকে শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল - এই মা ই একটা সময় প্রতিটা দিন আমাকে গোসল করিয়ে দিত, সাবানের ঝাঝে যখন আমার চোখ জলে যেত তখন মা সাথে সাথে আমার চোখে পানি ছিটিয়ে দিত, শরীর ঘষে ঘষে লাল করে দিয়ে মা ক্ষান্ত হতেন। আচ্ছা ওরা যখন আমার মাকে গোসল করাচ্ছিল তখন কী তার চোখ জলে যায়নি? হয়তো গিয়েছিল কিন্তু তার চোখে পানি ছিটিয়ে দেবার সাহস আমার হচ্ছিল না। মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হল, মাকে সাদা কাপড়ে মুড়ে তাতে শুইয়ে দেয়া হল। আমার মায়ের মুখটা কতটা নিষ্পাপ! কতটা পবিত্র!। মায়ের জানাজায় কয়েকশ লোক হয়েছিল, ছোট ভাইটা মায়ের জানা পড়িয়েছিল দুই ভাই ই কেমন যেন পাথর হয়ে গিয়েছিলাম
অথচ তিন বছর আগে যখন বাবা মারা যান তখন কাঁদতে কাঁদতে বিছানায় পড়েছিলাম আমি, মা আর ছোট ভাইটা কিন্তু আজ কিভাবে এত নিষ্প্রভ আমরা! হিসেব বড্ড গোলমেলে। মায়ের খাটিয়া নিজের কাধে তুলে কবর স্থানে নিয়ে গিয়ে মাকে দাফন করে বাসায় চলে আসি স্বাভাবিকভাবেই কিন্তু যখন মায়ের উপরে মাটি ফেলছিলাম তখন আবার গোঙানি দিয়ে কেঁদে দিয়েছিলাম, আমার কান্না দেখে ছোট ভাইটাও কেঁদে দিয়েছিল, বাবা মাও হয়তো কবরের নিচ থেকে সন্তানের কান্না দেখে কেঁদেছিল তখন । অনেক্ষন ধরে গুম ধরে থাকা ঘরটায় বসে আছি, একটা টিকটিকি অনেক্ষন ধরে ঘড়িটার উপর ঘুরে বেড়াচ্ছে মাকে দাফন করে আসলাম এক ঘন্টা সতের মিনিট আগে। ঘরের আলনাটা অগোছালো হয়ে থাকলে কেউ আর বকবে না আমাকে, কিরে আর কতক্ষন বাইরে থাকবি তুই.. বাড়িঘরে কি আসার দরকার নেই এমন কোন মধুর অভিযোগে কেউ আমার সেলফোনে শব্দ দ্যোতনা ছড়াবেনা। কেউ আর সকালে ঘুম থেকে তুলে বলবেনা.. এবার আল্লাহর ওয়াস্তে বাজারে যা বাবা বাজার উঠে যাবে আর শোন আসার সময় চিংড়ি নিয়ে আসবি আর কয়টা পান আনতে ভুলিস না কেউ বলবেনা আমাকে। এখন অনেক কিছুই মনে পড়ছে আমার, সময়ে অসময়ে কত খারাপ ব্যবহার করেছি এই মায়ের সাথে! রান্না ভাল না হলে উঠে যেতাম যত রাত ই হোক মা ঘরে এসে নতুন তরকারি দিয়ে ঠিকই গালে তুলিয়ে খাইয়ে দিয়ে যেত, খাবার শেষে হাসতে হাসতে বলত -তোর বউয়ের কপালে ভোগান্তি আছে রে, সঙ্গে সঙ্গে দুজনই হেসে দিতাম কিন্তু তার আগে মা যে কস্টটা পেত সেটার উপরে মলম দেবার মত বুদ্ধি আমার তখন ছিল না, কয়েক বছর আগে রুপা যখন আমাকে ফেলে অন্য ছেলের হাত ধরে চলে গিয়েছিল তখন মাকে জড়িয়ে ধরে প্রায় রাতেই কাঁদতাম, দুনিয়ার এই একটা মাত্র মানুষ ছিল যার কাছে চোখ বুজে সব কিছু বলে দিয়ে হালকা হয়ে যেতাম কেননা তখন আর কস্টটা আমার একার থাকত না। এই একটা মাত্র জীব ই দুনিয়াতে আছে যে কিনা অন্যর কস্টের ভাগ নিতে পারার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় কিন্তু কারনে অকারনে কতই খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি এই মায়ের সাথে!। একবার কল্পনা করা যাক -আমি বাইরে ছিলাম, বাসায় ফিরেই দেখি মা মারা গেছে তখন কেমন লাগত আমার! আমি আমার মায়ের মুখ থেকে শেষ কথাটা কখন শুনেছি সেটা মনে করতে পারতাম না, মৃত্যুর আগে মায়ের জীবন্ত দেহটাকে আঁকড়ে ধরতে পারতাম না। বাড়ি ফিরেই... ও মা....গো বলে আকাশ পাতাল এক করে দিতাম। জানি আজকের পর থেকে কেউ ঘামে ভিজে আমার জন্য রাঁধবেনা এতটা ভালবেসে, কেউ আমার শত খারাপ ব্যবহারের পরেও বলবেনা কিরে বাড়ি আসবিনা, অনেক রাত হল। কেউ বলবেনা। মায়ের গায়ের গন্ধটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। জানি আমার জ্বর আসলে কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে বলবেনা... রুটি ডিম নিয়ে আসছি চুপচাপ শুয়ে থাক। আবার এটাও জানি... আমার মাকে যখন আল্লাহ জান্নাতে বলবে.. সে কি চায় তখনো সে বলবে আমার সন্তানেরা সুস্থ থাকুক, ভাল থাকুক, অনেক সুখে থাকুক। তখনো হয়তো আল্লাহ পাক আমার মায়ের মুখের দিকে পরম মমতায় চেয়ে থাকবেন। কেননা এর চেয়ে সুন্দর সৃষ্টি আজ অবধি একটাও তিনি করেননি।

Love For Mother | Ecency