কিন্তু বেনসন অথবা গোল্ডলিফ কোনটাই তো উপাদেয় নয়। তবে গোল্ডলিফে ফিরে যেতে পারলে একটা লাভ আছে। চার টাকা বেঁচে যেত। আচ্ছা চার টাকা করে যদি প্রতিবার বাঁচানো যায় তাহলে সেটা কতটা কার্যকর হবে? ভাবতে থাকে রব। প্রতিদিন যদি ছয় বার চার টাকা করে বাঁচানো যায় তাহলে দিন শেষে চব্বিশ টাকা। মাস শেষে তা হবে টোটাল সাতশ বিশ টাকা। বাহ! নেহাত কম তো নয়। সামনে চাকরির জন্য যুদ্ধে নামতে হবে। তখন তো এরকম মাস শেষে সাতশ টাকাই অনেক বড় সাপোর্ট হবে।
ভাবতে ভাবতে আনমনেই হেসে ওঠে রব। ছোট বেলার কথা মনে পড়ে যায় তার। ছোটবেলায় তার একটা মাটির ব্যাংক ছিল। আসলে একটা না। কয়েকটাই ছিল বলা চলে। ব্যাংক গুলোর একটা সুন্দর নামও রেখেছিল রবের বোন। স্বপ্নের কানাকড়ি। যদিও এই নামের আগা মাথার কিছুই বুঝতো না রব তখন। অবে এখনো যে এই নামের স্বার্থকতা সে উদ্ধার করতে পেরেছে তাও না। যাই হোক, একটা ব্যাংক ভাঙা হলে আরেকটা কেনা হতো তখন। বেশিরভাগ সময় তার মা-ই কিনে দিতেন ব্যাংক গুলো। প্রতিবার প্রথম টাকাটা তিনিই রাখতেন। মা সব সময় প্রথমবার টাকা রাখার সময় বলতেন, “নতুন ব্যাংক কখনো খালি রাখতে হয় না রব। বুঝছো? খালি রাখলে ব্যাংকের বরকত কইমা যায়।“মার কথার গুরুত্ব বোঝা যাক আর না যাক, রব মাথা দুলিয়ে সাঁয় দিত সব সময়।
ছোট বেলায় রব এত গোছানো ছিল না। ক্রিকেট তার পছন্দের খেলা ছিল। তবে ক্রিকেট হচ্ছে কিছুটা খরুচে খেলা। বল – ব্যাট কেনার জন্য চাঁদা দিতে হতো। তাই রব তার মাটির ব্যাংকে খুব কমই টাকা রাখতো। বেশির ভাগ সময় বাড়ির বড়রাই টাকা রাখতো। সবচেয়ে বেশি থাকতো দুই আর পাঁচ টাকার কয়েন এবং নোট। দশ বিশ টাকার নোটও থাকতো মাঝে মাঝে। তবে আর যাই হোক ব্যাংক ভাঙার সময় অর্ধেকের বেশি টাকা থাকতো রবের ভাগেই। যদিও সেই টাকাও ক্রিকেটের পেছনেই ব্যয় হতো সবসময়। একবার রব একটি এম আর এফ ব্রান্ডের ব্যাট কিনেছিল জমানো টাকা দিয়ে। শচিন টেন্ডুলকারের মতো এতো বড় ক্রিকেটারের ব্যাটের ব্রান্ড ছিল এটা। তবে অনেক পরে বড় হয়ে সে জানতে পেরেছিল যে এম আর এফ কোন ক্রিকেটের ব্রান্ড না। এটা শচিনের স্পন্সরের নাম।
আজকে হঠাৎ ছোটবেলার এই কথাটা মনে পড়ে যাওয়ার পেছনে কি কারণ থাকতে পারে তা ভাবছে রব। ছোটবেলায় হয়তো অভাব ছিল। ফিনান্সিয়াল ইন্ডিপেন্ডেনস ছিল না। তবে যেটা ছিল, তা হচ্ছে একটি সরলরৈখিক জীবন। জীবনের জটিলতা, টানাপড়েন, অনিশ্চয়তা পরিবারে থাকলেও তা কোন প্রভাব ফেলতো না তার জীবনে। আসলে তার বয়সী সবাই তখন খুব সহজ সরল জীবন পার করতো। কারো মধ্যে ছিল না কুটিলতা, মেকিত্ব। সবাই তাই বলতো, যা তারা নিজেরা ভাবতো। রবের ছোট বেলার বন্ধু সজীবের একটি ব্যাট ছিল। তাই খেলার সময় তার গুরুত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি। এই বিষয়টা সজীব ধরতে পেরে সুযোগের সদ্ব্যবহারও করে নিত। ওকে প্রথম ব্যাট করতে না দিলে সে কখনো ব্যাট দিত না। রবের বন্ধুরাও এই বিষয়টাকে সজীবের অধিকার বলেই মনে করতো। তারা কখনো সজীবের এরকম ব্যবহারে অনৈতিকতার কোন ছায়া দেখতো না। তাদের সবার মনই ছিল সদ্য ফোটা লাল পদ্মের মতোই কমল। কিন্তু আজ এত বড় হয়ে যাওয়ার পর, প্রতিটি বন্ধুত্বের মধ্যে আসল নকলের ফারাক খুঁজতে গিয়ে আজ সে ক্লান্ত।
বড় সে হয়েছে ঠিকই। অর্থনৈতিক ভাবে লোক দেখানো স্বাবলম্বী সে হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু এই স্বাধীনতাই তার কাছে মনে হচ্ছে পাহাড়সম পরাধীনতা। চাকরী করো, নইতো ব্যবসা করো। অসীম কিন্তু অদৃশ্যমান চাপ সে বয়ে বেড়াচ্ছে স্কুলের গণ্ডি পেরোবার পর থেকেই। টেনিস বল কেনার জন্য যেখানে মাসের মাসের পর যে পরিমান টিফিনের টাকা জমাতো, আজ তার থেকে ঢের বেশি খরচ হয়ে যায় একদিনের সিগারেটের পেছনে। এটাকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বলা যায়? আর এই অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মানেই বা কি? এরকম স্বাধীনতা তো সে চাই নি কখনো। যেখানে এই স্বাধীনতার দোহায় দিয়ে তার খুবই কাছের মানুষ আজ তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে, কিন্তু প্রতিদিন হানা দিচ্ছে তার স্নিগ্ধ ভোরের অকৃত্রিম স্বপ্নে। রব ভাবছে, আজ যদি অর্থনীতির জনক পল স্যামুয়েলসনকে সামনে পাওয়া যেত, তাহলে হয়তো তার এই উত্তরহীন প্রশ্নগুলোর সদুত্তর পাওয়া যেত। তবে যদি আসলেই তিনি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে যেতেন তাহলে হয়তো বুর্জোয়ারা তাঁকে নোবেল প্রাইজের জন্য মনোনীত করতেন না।
হঠাৎ করে রবের মনে হলো আরেকটা সিগারেট ধরানোটা জরুরী এখন। কারণ আচমকা মনোহরিণী বৃষ্টি নেমেছে। এখন আর ভাবা যাবে না কিছু। স্যামুয়েলসন সাহেব এবারের মতো বেঁচে গেলেন রবের মত প্রলেতারিয়েতের কিছু অবাঞ্ছিত প্রশ্নের হাত থেকে। এবার একটু বৃষ্টি উপভোগ করবে রব। সিগারেট তো আছেই, এক কাপ চা আর বৃষ্টির সময় তার পছন্দের সেই গানটা হলে জমে যাবে একদম। তবে মনে হচ্ছে চা ম্যানেজ করা সম্ভব হবে না, যদিও সেটা কোন সমস্যা না। সমস্যাটা হচ্ছে গানটা তার ফোনে ডাউনলোড করা নেই। মনে আছে এরকমই কোন এক বৃষ্টির দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে দাড়িয়ে সে কাঁদছিল খুব। পছন্দের সব কিছু থেকে নিজেকে আড়াল করার একটা প্রতিজ্ঞা করেছিল সে। তবে প্রতিজ্ঞা করাই হয় ভাঙার জন্য। আজও সে ভাঙবে বলে ইউটিউবের সার্চ বক্সে সে সার্চ করা শুরু করলো হেমন্ত স্যারের সেই গান,
“এই মেঘলা, দিনে একলা
ঘরে থাকে না তো মন………“